• Home
  • Articles
  • Islamic :: Bangla
  • ইসরায়েল-ফিলিস্তীন: শত্রুমিত্র চিনলিনা রে মন !!

'হায়রে ভজনালয়’ !

'হায়রে ভজনালয়’ !

হাসান মাহমুদ - 3 August 2020

https://bangla.bdnews24.com/opinion/comment/63093

“হায়রে ভজনালয়,  তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়” - নজরুল  

ভণ্ড ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে ক্রোধে ক্ষোভে এতো বিস্ফোরিত হননি আর কোনো কবি লেখক।  তবে সে ছিল ব্যক্তির ভণ্ডামী।  এখন নজরুল ফিরে এলে মসজিদ মন্দির গীর্জা সিনাগগ নিয়ে রাষ্ট্রের কাণ্ডকারখানা দেখে হয়ত বিস্ময়ে পাথর হয়ে যেতেন, হয়ত সময়ের আগেই তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যেত।     

(ক) ক’দিন আগে লাহোরে শিখ উপাসনালয় ঐতিহাসিক গুরুদুয়ারা "নানক শাহি"-কে মসজিদে রূপান্তর করছে পাকিস্তান সরকার।  ঘটনাটিকে ভারত নাকি "গুরুতর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে” এবং খুবই গুস্সা করে নয়াদিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনে "কড়া প্রতিবাদ" জানিয়েছে।

(খ) স্পষ্ট:ই, ভারত সরকার তীব্র স্মৃতিভ্ৰংশ রোগে ভুগছে।  মাত্র কমাস আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সে ঐতিহ্যবাহী বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সেই ভাঙ্গাগড়ার ছবি ও খবর প্রকাশিত হবে সর্বত্র, চিরকাল থেকে যাবে ইন্টারনেটে।  বিজয়ের  উল্লাসে ফেটে পড়েছেন অনেকেই।  তাঁদেরকে কে বোঝাবে ওটা কোনো বিজয় নয়, ওটা ইলোরা অজন্তা হরপ্পা মহেঞ্জোদাড়ো ময়নামতি পাহাড়পুর মহাস্থানগড়ের প্রাচীন সভ্যতার পরাজয়।

(গ) ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের জন্ম হবার আগে থেকেই সেখানে অনেক মসজিদ ছিল।  ইসরায়েলের নিষিদ্ধ সংগঠন "ইসলামিক মুভমেন্ট"-এর ডেপুটি নেতা শেখ কামাল খতিবের গবেষণা থেকে “মুসলিম মিরর” মিডিয়া জানাচ্ছে:-

  • প্রায় ৪০টি মসজিদ ধ্বংস, বন্ধ বা নিষিদ্ধ করেছে,
  • কমপক্ষে ১৫টি মসজিদকে সিনাগগ বানিয়েছে,
  • ১৭টি মসজিদকে রেস্টুরেন্ট, মদ্যপানের বার ও মিউজিয়াম বানিয়েছে।
  • এর মধ্যে আছে আল-জাদিদ, আইন হাদ ও আল-সিকসিক মসজিদকে মদ্যপানের বার এবং আল-আহমার মসজিদকে কনসার্ট হলে পরিণত করা।
  • ওই অঞ্চলে ক্রমাগত যুদ্ধে যেসব মুসলিম পরিবার অন্য দেশে চলে গিয়েছিল, ইসরাইলও আইন বানিয়ে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে যার মধ্যে অনেক মসজিদ ছিল।

লক্ষ্যনীয়, জাতিসংঘে ৫৭টি মুসলিম দেশের শক্তিশালী সংগঠন ও-আই-সি (অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন)-এর শক্তিশালী উপস্থিতি আছে।  ইসরায়েলের এই ইসলাম-বিরোধী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তার কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ বা জাতিসংঘে কোনো উদ্যোগের খবর আমরা পাইনি। এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের অগণিত আলেম মওলানারাও তাদের ওপর কেন চাপ সৃষ্টি করেননি সেটাও স্পষ্ট নয়।

(ঘ)  এবারে তুরস্ক।  ১৪৫৩ সালে তুরস্ক-বিজয়ী সুলতান ফাতিহ মুহাম্মদ কনস্টান্টিনোপলে বিশ্বের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংখ্যাগুরু খ্রীস্টানদের সর্বোচ্চ ভজনালয় হায়া সোফিয়াকে (যা আমাদের কাবা পোপের ভ্যাটিক্যান শিখদের স্বর্ণমন্দিরের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ উপাসনালয়) মসজিদে রূপান্তরিত করেন। ওটা নাকি তিনি কিনেছিলেন।  কার কাছ থেকে কিনেছিলেন?  কাবা, ভ্যাটিক্যান, স্বর্ণমন্দির, এগুলো কি বিক্রি করা যায়? কেনা যায়?  পরিচালনা কমিটি উপাসনালয় গুলোর খাদেম মাত্র, মালিক নন।  সৌদি বাদশা যেমন কাবা শরীফের "খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন", ঠিক তেমনি। 

১৯৩৫ সালে কামাল আতাতুর্ক সেটাকে জাদুঘর করেছিলেন, এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সরকার সেটা মসজিদ করেছে।  বিজয়ের উল্লাসে ফেটে পড়েছেন মুসলিম-বিশ্বের অনেকেই। তাঁরা খেয়াল করছেন না তুরস্কের এ সিদ্ধান্ত ভারতের বাবরি-গ্রাস ও ইসরায়েলের মসজিদ-গ্রাসকে বৈধ করে দিল, সেইসাথে বর্তমান মসজিদগুলোকেও বিপদের মধ্যে ফেলে দিল। নিজে কাঁচের ঘরে বাস করে অন্যের ঘরে ঢিল ছোঁড়া ঠিক নয়। তাঁরা খেয়াল  করছেন না  ইসলামের বিজয় ন্যায়বিচার ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে, কোর্ট কাচারী করে ইমারত দখলের মধ্যে নয়।  ইস্তানবুল শহরে অসংখ্য মসজিদ আছে, ১৬১০ সালের দিকে বানানো সুলতান আহমেদ মসজিদ (The Blue mosque) একাই ১০ হাজার মুসল্লি ধারণ করতে পারে।  তার পরেও হায়া সোফিয়াকে জাদুঘর থেকে মসজিদ বানানোর কোন ইসলামী  বা মুসলিম প্রয়োজন ছিলনা, রাজনৈতিক প্রয়োজন থাকতে পারে। 

উপাসনালয় হোক বা সীমানা হোক, "ওটা আগে আমাদেরই ছিল" এই ভয়ংকর অন্তহীন চক্রটা মানবতার অবর্ণনীয় ক্ষতি করেছে।  ১৯৩৯ সালের ০১ সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুটাই হয়েছিল জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের "পোলিশ করিডোর"  আক্রমণ থেকে, হিটলারের ওই দাবীর ভিত্তিতে -"ওটা আগে আমাদেরই ছিল"।  দাবীটা মিথ্যে নয়। বাল্টিক সাগরের তীরে ওই অঞ্চলটা আগে জার্মানীরই ছিল, ওখানকার প্রায় সবাই নৃতাত্বিক দিক থেকে জার্মান এবং তাঁরা জার্মান ভাষাতেই কথা বলেন।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানী হেরে গেলে ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ভার্সাই-এর ক্যাস্পিয়ন জঙ্গলে এক ট্রেনের কামরায় বসে বিজয়ীরা জার্মানীর ওপরে অত্যন্ত বর্বর অমানবিক "ভার্সাই চুক্তি" চাপিয়ে দেয়।  তার মধ্যে একটা চুক্তি ছিল জার্মানীর ওই অঞ্চলটা পোল্যান্ডকে দেয়া যাতে চারিদিকে স্থলবদ্ধ পোল্যান্ড বাল্টিক সাগরের সুবিধে পায়। যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে প্রায় আট কোটি লোক খুন হয়, ১৯৪৫ সালের ৬ই ও ৯ই আগস্ট হিরোশিমা নাগাসাকিতে লক্ষ নিরপরাধের ওপরে আণবিক বোমার হত্যাযজ্ঞ করা হয়, অগণিত সম্পত্তি ধ্বংস হয়। 

উপাসনালয় নিয়ে এ কালখেলা বন্ধ হোক।  দুনিয়ার সব উপাসনালয় যেভাবে আছে সেভাবেই থাকুক, দরকার মতো নুতন বানানো হোক।  

ভজনালয় "লইয়া খেলা?

বড় কাল খেলা !

এই বেলা ভেঙে দাও খেলা, নহে তুমি সে খেলার হইবে খেলনা" - বিসর্জন - কবিগুরু। 

Print