মৌদুদী-নিজামী, কেন ওরা পিশাচ?

মৌদুদী-নিজামী, কেন ওরা পিশাচ?

হাসান মাহমুদ

২৫শে জুলাই ৪৩ মুক্তিসন (২০১৩)

রাষ্ট্রের বৈধ আদালতের রায়ে মৌদুদী-নিজামী দুজনই গণহত্যার খুনী। মৌদুদীর ফাঁসীর রায় হয়েছিল নিজামীও ফাঁসী হবার যোগ্য অপরাধ করেছেন বলে রায়ে বলা হয়েছে। একাত্তরে লক্ষ মা-বোন ও নিরপরাধের ওপরে জামাতের হিংস্র বর্বরতা তাও আবার ইসলামের নামে-নিজামী-মুজাহিদীদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিলনা ওটা ছিল পাকিস্তান জামাতের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত, সেটা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান জামাতের সাথে আলোচনা করেই নেয়া হয়েছিল। এবং মৌদুদী ছিলেন ১৯৭২ পর্য্যন্ত পাকিস্তান জামাতের আমীর, ১৯৪১ সালে জামাত প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটানা ৪১ বছর, মারা যান ১৯৭৯ সালে। তাই মৌদুদী একাত্তরের অন্যতম প্রধান যুদ্ধাপরাধী। তাঁর ফাঁসীর রায়ের ঘটনাটা এরকম:-

-- ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫৩- জামাত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনকে আলটিমেটাম-চিঠি দিল আহমদীদেরকে সাংবিধানিকভাবে অ-মুসলিম ঘোষণা করতে।

-- জামাতের আমীর মৌদুদী লিখলেন "কাদিয়ানী সমস্যা", সেটা পুস্তিকা হিসেবে প্রকাশের আগে হাজার হাজার কপি উন্মত্ত জনতার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হল। ওই পুস্তিকা ও তাঁর হিংস্র বক্তৃতায় জনতা আরো হিংস্র হয়ে উঠল।

-- ২৭শে ফেব্রুয়ারী মন্ত্রী-নেতারা আলটিমেটাম নাকচ করে কয়েকজন মোল্লা-নেতাকে গ্রেপ্তার করল।

-- সাথে সাথে হাজার হাজার জামাতীরা অস্ত্র হাতে নিরীহ নিরস্ত্র আহমদীদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে কচুকাটা করে ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আমাদের একাত্তরের মত আগুন ও রক্তের বন্যা বইয়ে দিল। অসংখ্য জামাতীদের গর্জনে হুঙ্কারে ও হাজার হাজার আহমদীদের আর্তনাদ চিৎকারে, হাজারো লাশ আর জ্বলন্ত ঘরবাড়ীতে কেঁপে উঠল দেশ, কেঁপে গেল আল্লাহ'র আরশ। লাহোরে ৩ দিনে প্রায় পনের হাজার আহমদী নৃশংসভাবে খুন হয়েছে বলে জানা যায়,ধর্ষণও না হবার কোনো কারণ নেই। মৌদুদীর "কাদিয়ানী সমস্যা" বইটা এই গণহত্যার প্রধান উত্তেজক।

-- ০৬ মার্চ লাহোরে মার্শাল ল'জারী করে আর্মীর হাতেশহর তুলে দেয়া।

-- ০৭ ও ১১ মে - জঙ্গী বই ও বক্তৃতা দিয়ে জনতাকে হিংস্রতা ও গণহত্যায় উসকে দেবার অপরাধে আদালতে মওলানা সাত্তার নিয়াজী ও মওদুদীর ফাঁসীর আদেশ।

-- ১৩ই মে- সৌদি আরবের চাপে মওদুদীর (ও নিয়াজীর) ফাঁসী কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ।

-- ১৫ ই মে - মার্শাল ল' তুলে নেয়া।

-- পরে সৌদি আরবের চাপে (ও সৌদি যুবরাজ পাকিস্তানে এসে দেন দেবার করাতে?) মওদুদীকে ছেড়ে দেয়া।

-- ১৯ জুন তদন্তের জন্য সরকার বানাল "মুনির কমিশন"- প্রধান বিচারপতি মো: মুনির ও বিচারপতি রুস্তম কায়ানিকে নিয়ে। কমিশন ১৯৫৪ এপ্রিলে তার রিপোর্ট প্রকাশ করে, যা "মুনির কমিশন রিপোর্ট" নাম বিখ্যাত।

সরকারের ক্ষমায় ছাড়া পেলেও মউদুদী আদালতের বিচারে গণহত্যার প্রমাণিত খুনী হয়েই আছেন, চিরকাল প্রমাণিত খুনী হয়েই থাকবেন। নিজামীও গণহত্যার প্রমাণিত খুনী, আপীলে নির্দোষ প্রমান না হওয়া পর্য্যন্ত। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় আসামী ছাড়া পেলেও আদালতের রায় নাকচ হয়ে যায় না- আদালতের প্রমাণিত খুনী চিরকাল প্রমাণিত খুনীই থেকে যায়। আমরা যারা একাত্তর দেখেছি আমরা জানি জনতার আদালতে মৌদুদী-নিজামীরা ঘৃণিত আসামী হয়েই থাকবে চিরকাল ।

সব আদালতের ওপরে আছে সর্বোচ্চ এক আদালত। সেখানে–“আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবে- 'হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা? এ যে ছোটবড় কোনোকিছুই বাদ দেয়নি- সবই এতে রয়েছে'। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আর আপনার পালনকর্তা কারো প্রতি জুলুম করবেন না" - সুরা কাহফ ৪৯।

এই সেই দানব যে লক্ষ মানুষ হত্যা আর লক্ষ নারী-ধর্ষণের মাধ্যমে করে আল্লাহ'র ইবাদত। নিজের মাতৃগর্ভের কলংক এই সেই পিশাচ যার বুকে আর্ত মানবতার আহ্বান ব্যর্থ করাঘাত করে ফিরে যায়, লক্ষ্ নিরপরাধের আর্তনাদ হাহাকারের মধ্যে অট্টহাসির উল্লাসে যে পায় বেহেশতের খুশবু ! মানবতা ও প্রগতির এরাই সেই ঘোর শত্রু যারা আলোয় দেখে অন্ধকার আর অন্ধকারে দেখে জীবন।

একাত্তরে তাঁরা যা করেছেন তার প্রতিটি রক্তকণা, প্রতিটি আর্তনাদ, প্রতিটি রমনীর সম্ভ্রম, প্রতিটি এতিমের অশ্রু আর ধ্বংসযজ্ঞ এসে তাঁদের গলা চেপে ধরবে।

ধরবে না?

ওদিকে জাহান্নামের আগুন তো লকলক করছেই !!                              

Print