• Home
  • Articles
  • Islamic :: Bangla
  • নিষিদ্ধ জামাত ও যেভাবে জামাত-মুক্ত গ্রাম সম্ভব হল

নবীর ছবি, কোরাণ পোড়ানো, বাক্‌স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতি

কি আর বলব. অনেক দু:খে চুপ করে থাকতে হয় আবার চুপ করে থাকলে চলেও না. ওরা আর নবীকে কি অপমান করেছে, ওদের চেয়ে নবীকে শতগুণ বেশী অপমান করেছি আমরাই. প্রমাণ চান? খুলে দেখুন সহি বুখারী ১ম খণ্ড হাদিস ৩৬০. পুরো উদ্ধৃতি দিতে রুচি হয়না - আমাদের নবীকে আমরা একেবারে কাপড়হীন নগ্ন করে ছেড়েছি. শুধু কি মুহাম্মদ (স:) একা ? খুলে দেখুন সহি বুখারী ১ম খণ্ড হাদিস ২৭৭, আমরা নগ্ন করে ছেড়েছি হজরত আইউবকেও, আর হজরত মুসাকে তো নগ্ন করে সবার সামনে দৌড়িয়েছি.

২০০১ সালে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরে ইসলাম বিষয়ে গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা হল সেপ্টেম্বর ২০০৫ সালে ডেনমার্কের জিল্যান্ড পষ্টেন নামের খবরের কাগজে ‘‘প্রফেট’স কার্টুন’’ অর্থাৎ নবীর ছবি এবং ২০১০ সালে ফ্লোরিডার এক চার্চের পাদ্রীর কোরাণ পোড়ানোর হুংকার। আসলে ওটা নবীর ছবি মোটেই নয়, কেন তা পরে বলছি, কিন্তু এগুলো ভবিষ্যতের ভয়ংকর সমস্যার ইংগিত । আমরা দেখব এর কি সমাধান কোরাণ-রসুল আমাদের দিয়েছেন। কিন্তু তার আগে ঘটনার পটভুমিটা জানা দরকার।

জিল্যান্ড পষ্টেন-এ কার্টুনিষ্ট কুর্ট ওয়েষ্টারগার্ড-এর আঁকা বারোটা উষ্কানীমূলক কার্টুন ছাপা হয়েছিল

মুসলিম সন্ত্রাসীদের নিয়ে। অনেকেই সেগুলোর মধ্যে কয়েকটাকে আমাদের নবীজী’র ছবি হিসেবে ধরে নিয়েছিল। খবরটা তখনই মিসরের খবরে কাগজে উঠেছিল কিন্তু কোনো হৈ হল্লা হয়নি। দীর্ঘ পাঁচ মাস পরে ডেনমার্কবাসী এক মিসরী মওলানা মিসরে গিয়ে এ নিয়ে আগুন জ্বালালেন। মুসলিম বিশ্বে প্রচণ্ড

বিক্ষোভ শুরু হল, কার্টুনিষ্টকে খুন করার পরিকল্পনা হল এবং তা ফাঁস হয়ে ডেনমার্কে তিনজন মুসলিম গ্রেপ্তার হল, মুসলিম-বিশ্বে গীর্জা-মসজিদে হামলা ও পাল্টা হামলা হল এবং সংবাদমাধ্যমগুলোতে পশ্চিমের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গারের বন্যা বইতে লাগল, বিভিন্ন দেশে কিছু ড্যানিশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ ও বোমাবর্ষণ হল, জাতিসংঘের কাছে প্রতিবাদ গেল এবং মুসলিম বিশ্বে প্রায় ৫০জন খুন হল যার বেশীর ভাগ মুসলমান। কিছু পত্রিকা কার্টুনের বিপক্ষে ছিল যেমন কোনো বৃটিশ পত্রিকা কার্টুনগুলো ছাপায় নি এবং অ্যামেরিকান সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছে।

তারপর মুসলিম-বিশ্বের হৈ হৈ দেখে বিপক্ষ দল মজা পেয়ে আবারো ঢোলের বাড়ি দিল; ডেনমার্কসহ সাতটা ইউরোপিয়ান দেশ ও ক্যানাডায় কার্টুনগুলো আবারও ছাপা হল। সত্য-মিথ্যা জানা সম্ভব না হলেও ইন্টারনেটে নানারকম ইসলাম ও মুসলিম-বিরোধী খবর উঠল যেমন আল্‌ কোরাণকে টয়লেটে টাঙ্গিয়ে রাখা বা ছিঁড়ে টয়লেটে ফ্লাশ করা, কোরাণকে টার্গেট করে বন্দুক-প্র্যাক্টিস করা কিংবা রাতের আঁধারে কার্টুনগুলোর ফটোকপি ছড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। বেশ কিছু মুসলিম-প্রধান দেশে ড্যানিশ দুগ্ধজাত খাবার আমদানী নিষিদ্ধ হল, ওটাই ওদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানী আয়। মুসলিম-বিশ্ব বুঝলনা যে কার্টুনের সাথে দুগ্ধজাত খাবারের কোম্পানী’র কোনই সম্পর্ক নেই, বরং ওই কোম্পানীতে অনেক মুসলমান কাজ করেন যাঁরা চাকরী আর সম্মান নিয়ে মহা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। মুসলিম-বিশ্বের দাবী ছিল জিল্যান্ড পষ্টেন যেন ক্ষমা প্রার্থনা করে। সেটা তো দুরের কথা ইউরোপিয়ান সংবাদপত্র জগৎ বাক্‌-স্বাধীনতার দাবীতে সোচ্চার হল ও কার্টুনিষ্ট কুর্ট ওয়েষ্টারগার্ডকে ‘‘মৌলিক সাংবাদিকতা’’-র জন্য পুরষ্কার দিল। অর্থাৎ মত-প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় তারা খোলাখুলি মুসলিম-বিশ্বের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেল। এরপর অ্যামেরিকায় ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে কোরাণ-পোড়ানোর মত ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। ফ্লোরিডার পাদ্রী টম জোনস আগে থেকেই ১১ই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ার ধ্বংসবার্ষিকীতে জনসমক্ষে কোরাণ-পোড়ানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল। পরে অ্যামেরিকান সরকারের, বহু ইহুদী-খ্রীষ্টান পাদ্রীদের, কিছু টিভি-রেডিয়ো সংবাদমাধ্যম ও জনগণের চাপে সে পিছিয়ে গেছে। কিন্তু তার পরেও অন্য ষ্টেটে জনসমক্ষে কোরাণ পুড়িয়েছে দু’জন সাধারণ নাগরিক, সেটা আবার সংবাদমাধ্যম তেমন প্রকাশ করেনি।

পশ্চিমা আইনে এসব সাংবিধানিক অধিকার। তাই সংবাদপত্রগুলো সরকারের পরোয়া করেনা, সরকারও কারো মতপ্রকাশে বাধা দিতে পারেনা। অর্থাৎ মুসলিম-বিশ্ব যতই বিক্ষোভ করুক মূল অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরেই। এর মধ্যে মুসলিম-বিশ্বের দেশগুলোকে নিয়ে গড়া ও-আই-সি (অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন) জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে কব্জা করে সিদ্ধান্ত পাশ করেছে, শারিয়া আইনে নারী নির্যাতন হলেও কমিশনে তার প্রতিবাদ তো দুরের কথা তা নিয়ে আলোচনাই করা যাবে না। মানবাধিকার কমিশনের সিদ্ধান্ত কোনো দেশ মানতে বাধ্য নয় তবুও কোনো কোনো দেশ এ আইন করবে এবং বাকিদের ওপরে এ আইন করার চাপ পড়বে। ওআইসি এখন চেষ্টা করছে জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাধ্যতামূলকভাবে এ আইন পাশ করতে যাতে ধর্মের নামে অত্যাচার হলেও তার সমালোচনা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে বাক্‌ স্বাধীনতার সুযোগে সব ধর্মের কিছু নষ্ট মানুষ অন্যায় কথা বলছে, আবার সেই অন্যায় কথার বাহানায় ওআইসি’র মাধ্যমে সৌদি আরব, পাকিস্তান বা মিসরের মত অত্যাচারী দেশগুলো দুনিয়ার মুখ বন্ধ করতে চাচ্ছে যেন কেউ প্রতিবাদ না করতে পারে। দুনিয়া যেন ভয়ংকর এক হাঙ্গরের দুই চোয়ালের মধ্যে পড়ে গেছে। সব ধরণের অত্যাচার প্রতিরোধ করা জরুরী, কিন্তু বাক্‌স্বাধীনতা না থাকলে অত্যাচার প্রতিরোধ দুরের কথা প্রতিবাদই করা যায় না। তাই বাক্‌-স্বাধীনতার বিকল্প নেই। কিন্তু তার একটা সীমাও থাকা উচিত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে, সেই সীমাটা কোথায়, কার কোন্‌ কথায় কার মনে কি আঘাত লাগবে, কোন কথাটা কিভাবে বললে ধর্মের সমালোচনা হয়, কখন সেটা যৌক্তিক আর কখন অযৌক্তিক এসবের সীমারেখা টানা একেবারেই অসম্ভব। তাই ধর্মকে সমালোচনা করার অধিকার বনাম বাক্‌স্বাধীনতা –এ দ্বন্দ্বের সুরাহা হয়নি।

আসলে ওই কার্টুন বা কোরাণ-পোড়ানো মূল রোগ নয়, রোগের লক্ষ্মণ মাত্র। মূল রোগটা হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে মুসলিম বিশ্বের দ্বন্দ্ব। আমরা জানি মুসলিম-বিশ্বে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতি ঢালাওভাবে ঘৃণা-প্রচার হয় এবং সেসব খবর পশ্চিমে পৌঁছে যায়। ওদিকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের একটা অংশ সুযোগ পেলেই ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়, কিছু ইসলাম-বিদ্বেষী লেখক-সংগঠনও আছে। সংবাদমাধ্যমে ও ইন্টারনেটে

শারিয়া রাষ্ট্রগুলোতে শারিয়া আইনে নারী ও অমুসলিমদের ওপরে মর্মান্তিক অত্যাচারের খবর ক্রমাগত আসছে। তাই শারিয়া নিয়ে পশ্চিমারা অত্যন্ত ভীত। সব মিলিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসলাম-বিদ্বেষ ও ইসলাম-ভীতি বাড়ছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পশ্চিমেরমুসলিম সংগঠন ও নেতাদের উদ্দেশ্য হল নানা কুটকৌশলে শারিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করা, সেটাও পশ্চিমাদের কাছে ধরা পড়ে গেছে। এদিকে মুসলিম বিশ্বের নেতারা দুরে থাকুক, পশ্চিমে বসবাসকারী মুসলিম সংগঠন ও নেতারাও সাধারণভাবে মুখমিষ্টি কিছু কথা ছাড়া কাজেকর্মে ‘‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’’ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই পশ্চিমা বিশ্বে ড্যানিশ কার্টুন ও কোরাণ পোড়ানোর মত আরো ইসলাম-বিরোধী ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

দুনিয়াতে নবীর শতশত ছবিই শুধু নয় মূর্তিও আছে। শত শত বছর ধরে ইরাণের অভিজাত বাড়িগুলোর ড্রইংরুমে ঝোলানো আছে ছোট সুদৃশ্য কার্পেটে তোলা মা আমিনার কোলে শিশুনবী, বোরাকে চড়ে উড়ে যাওয়া আর সাহাবি পরিবেষ্টিত নবীর ছবি। ওগুলো সব শিল্পীর কল্পনা থেকে বানানো । অ্যামেরিকার সুপ্রীম কোর্টের দেয়ালে সম্মানের সাথে রাখা আছে পৃথিবীর অন্যতম আইনদাতাদের কাল্পনিক মুর্তি, প্রাচীন ব্যবিলনের রাজা হাম্বুরাবী সহ। এর মধ্যে নবী’র মুর্তিও আছে যা নিয়ে মুসলিম সংগঠনেরা আপত্তি করেছিল কিন্তু কাজ হয়নি। নিউইয়র্কের আপীল বিভাগের আঙ্গিনাতেও ছিল নবী’র মুর্তি যা মুসলিম সরকারগুলোর দেন-দরবারের কারণে সরানো হয়।

একটু পিছিয়ে আসা যাক; একটু দম নিয়ে চিন্তা করা যাক। ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা সমালোচনা চিরকালই হয়েছে, চিরকালই হবে। সালমান রুশদী’র ইসলাম-বিরোধী বই ‘‘স্যাটানিক ভার্সেস’’ তো এখনকার কথা, সেই ১৯২৬ সালেই নবীজি’র নারীদের নিয়ে ‘‘রঙ্গীলা রসুল’’ নামে বই প্রকাশ করেছিল রাজপাল, খুন হয়ে গিয়েছিল এক মুসলিমের হাতে। সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বহু হিন্দু-মুসলিম মর্মান্তিকভাবে খুন হয়েছিল। আমরাও হিন্দু-খ্রীষ্টান-ইহুদী ধর্ম নিয়ে একই রকম ঘৃণ্য ঠাট্টা-তামাশা করেছি। আজ “নবীর কার্টুন” নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করছি অথচ বহু বছর আগে থেকে আরব দেশগুলো ও মিসরের খবরের কাগজগুলোতে ঈহুদী ধর্ম নিয়ে ক্রমাগত জঘন্য ঠাট্টা-তামাশা আমি স্বচক্ষে দেখেছি। কোন মুসলিম সরকার তার প্রতিবাদ করেনি, সেটা বন্ধ করেনি। সেজন্যই যখন সৌদি মন্ত্রী প্রিন্স তায়েফ ভ্যাটিক্যানের পোপকে বলেছিলেন ইসলাম নিয়ে কার্টুন বন্ধ করার আদেশ জারী করতে তখন পোপ সটান বলে দিয়েছিলেন বাইবেলের কথাঃ - ‘‘অন্যকে যা করতে বল, আগে নিজেরা তাই কর’’। কথাটা কিন্তু আমাদের নবীজীরও। মনে আছে, এক লোক যখন তার ছেলেকে এনে নবীজীকে বলল,- ‘‘ছেলেটা এত মিষ্টি খেতে চায়, আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন’’, তখন নবীজী কি করেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, পরের সপ্তাহে এসো। পরের সপ্তাহে লোকটা ছেলে নিয়ে এল, নবীজী তাকে বোঝালেন, ছেলেটা মিষ্টি খাওয়া বন্ধ করল। লোকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল নবীজী তো ছেলেটাকে আগের সপ্তাহেই বোঝাতে পারতেন, পরের সপ্তাহে কেন আসতে বললেন। নবীজী হেসে বলেছিলেন, “বাপু, আমি নিজেই তো মিষ্টি খেতে পছন্দ করি এবং খাই। গত এক সপ্তাহে আমি মিষ্টি খাওয়া কমিয়েছি, তাই বোঝাবার বৈধতা আমার হয়েছে”। অর্থাৎ তাঁর বাণী হল ‘‘অন্যকে যা করতে বল, আগে নিজেরা তাই কর’’।

আমরা কি তা করেছি ? না, করিনি, নীচে প্রমাণ দেখুন। ইহূদীদের প্রতীক

খেয়াল করুন, প্রতিটি কার্টুনে ইহুদী ধর্মের প্রতীক আছে এবং এগুলো নিউইয়র্কের নরমেধযজ্ঞ, ড্যানিশ কার্টুন বা কোরাণ পোড়ানোর বহু আগের কার্টুন। এখন বলুন, ওদের যে আমরা ইসলাম নিয়ে ব্যঙ্গ বন্ধ করতে বলব, বলবটা কোন মুখে? সবারই ধর্মীয় প্রতীক তার কাছে অত্যন্ত সম্মানের নয়? কোনো মুসলিম সরকার এর বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেনি। ড্যানিশ কার্টুনের সমালোচনা করে যে অ্যামেরিকান ষ্টেট ডিপার্টমেÏট বলেছেঃ- ‘‘ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়ীক হিংসাকে উষ্কাইয়া তুলে এমন কার্টুন গ্রহনযোগ্য নহে’’, সেই অ্যামেরিকান ষ্টেট ডিপার্টমেÏটও মুসলিম বিশ্বে ঈহুদী-খ্রীষ্টান ধর্মের প্রতি এ ধরণের কার্টুনের ব্যাপারে নীরব।

এই কার্টুনবাজী দু’পক্ষ থেকেই বন্ধ করতে হবে। হ্যাঁ, সাধারণ ফিলিস্তিনীদের ওপরে ইসরাইল যে বর্বর গণহত্যা চালাচ্ছে তা প্রমাণিত এবং তার বিরুদ্ধে মুসলিম- অমুসলিম সহ বিশ্ব-বিবেকের কন্ঠ চিরকালই সোচ্চার। কিন্তু সন্ত্রাসী ইহুদী রাষ্ট্র এবং দুনিয়ার সাধারণ খেটে খাওয়া ইহুদীরা এক নয়। কিছু উচ্চস্তরের ইহুদী পশ্চিম সংবাদমাধ্যম ও সরকারের ওপরে ইসলাম-বিরোধী প্রভাব রাখে এটা ঠিক। কিন্তু তার বাইরে বহু ইহুদী ইসরাইলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার কারণ এতে তাদের ধর্মের বদনাম হয়। প্রমাণ চান? দিচ্ছি

গতবার গাজা’র ওপরে যখন ইসরায়েলী ট্যাংক নেমে গণহত্যা চালাল তখন আমার শহর টরন্টোতে কিছু বর্ষিয়ান ইহুদী মহিলা ইসরায়েলী দূতাবাসে ঝটিকা প্রবেশ করে চীৎকার করে অবস্থান ধর্মঘট করল, তাদের হাতে পোষ্টার ছিল -‘‘হে ফিলিস্তিনীরা! তোমরা একা নও, আমরা তোমাদের সাথে আছি’’। পরে পুলিশ ডেকে তাদের জোর করে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে হয়। বহু ইহুদী ফিলিস্তিনে ইসরাইলের গণহত্যার বিরুদ্ধে বলে ও লিখে চলেছেন। এগুলো মুসলিম নেতারা আমাদের জানতে দেন না কারণ তাঁরা চান আমরা দুনিয়ার সব ইহুদীর ওপরে সর্বদা ক্ষিপ্ত হয়ে থাকি, তাহলেই তাঁরা আমাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পারবেন। ইসলামের শান্তি বাণী দিয়ে সমাজকে নেতৃত্ব দিতে মেধা দরকার. তার চেয়ে ঘৃণা দিয়ে সমাজ-নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সোজা।

ড্যানিশ কার্টুনের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠেছেন বহু খ্রীষ্টান-ইহুদী। উঠেছেন ফ্রান্সের ও ক্যালগেরী’র সর্বোচ্চ ইহুদী ধর্মনেতা দু’জন রাবাই - জোসেফ সিটরুক ও মিঃ নেলসন। জোসেফ সিটরুক তীব্রকণ্ঠে বলেছেনঃ - ‘‘কার্টুন প্রকাশের পরে বিশ্ব-মুসলিমের যে ক্রোধ আমি তাহাকে সম্পুর্ণ সমর্থন করি। কোন ধর্মকে অপমান করিয়া কেহই কিছু লাভ করিতে পারে না, ইহা অত্যন্ত অসৎ কর্ম। মুসলমানদের যদি আত্মসমালোচনা করার কিছু থাকে তবে তা তাহারাই করুক’’।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে কিছু মুসলিম সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে ত্রাসের সকাল হয়ে থাকবে। সারা পশ্চিমা বিশ্ব এক আতংকিত আর কোনদিন হয়নি। সেই দুঃসময়ে দু’একটা চিহ্নিত ইসলাম-বিরোধী ওয়েবসাইট ছাড়া অ্যামেরিকান ইহুদি-খ্রীষ্টানদের গীর্জা-সিনেগগ-গুলোর ওয়েবসাইটে জনগণের প্রতি আহ্বান ছিল কেউ যেন কোন মুসলমানের ওপরে হামলা না করে কারণ এটা মুষ্ঠিমেয় কিছু পথভ্রষ্ট সন্ত্রাসীর অপকর্ম, এর জন্য পুরো বিশ্ব-মুসলিম দায়ী নয়। দেখুন সেই ভয়ংকর দিনে অ্যামেরিকাবাসী এক বাংলাদেশী মঈনুল আহসান-এর অভিজ্ঞতা। আংশিক তুলে দিচ্ছি সাপ্তাহিক ওয়েবসাইট নতুনদেশ-এর ঈদসংখ্যা, ০৮ই সেপ্টেম্বরে ২০১০ থেকে, ঠিক এই সংবাদগুলোই আমাদের ধর্মীয় নেতারা চান না আমরা জানি
http://www.notundesh.com/motmotantor_news1.html

১১ই সেপ্টেম্বর ২০০১।

.....মসজিদ সোজা নর্থ ফার্ষ্ট ষ্ট্রীটে ঘুরতেই চোখে পড়ল গাছপালার আড়ালে পুলিশের গাড়ী। মসজিদের ড্রাইভওয়েতে ঢোকার মুখেও দেখলাম উল্টোদিকে পুলিশ। বুঝলাম পুলিশ কর্ডন করে রেখেছে পুরো মসজিদ এলাকা। অবশেষে সবার আশংকা ভুল প্রমাণ করে আমরা নামাজ পড়লাম নির্বিঘ্নে যদিও অন্য জুমার তুলনায় সেদিন মসজিদে মুসল্লি ছিল প্রায় অর্ধেক কম। তবে সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম মসজিদের লবিতে বিশাল ফুলের তোড়া দেখে। তোড়ার সাথে ছিল একটা চিরকুট, তাতে লেখা ছিল, ‘‘আমরা তোমাদের প্রতিবেশী, তোমাদের শুভাকাংখী, অতিতের মত আগামীতেও আমরা পাশাপাশি থাকব শান্তির সাথে এটাই আমাদের আশ্বাস, বিশ্বাস ও প্রার্থনা’’। ঐ তিনদিনে প্রায় পঞ্চাশটা ম্যাসেজ রেকর্ড হয়েছিল মসজিদের টেলিফোনে। তার একটা ছিল চরম বিদ্বেষময়, অশ্লীল গালিতে পুর্ণ। করিৎকরমা পুলিশ দেরী করেনি, দ্রুত ধরে জেলে পুরেছিল ম্যাসেজদাতা মাতাল যুবককে। বাঁকি উনপঞ্চাশটা ম্যাসেজই ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য, অচিন্ত্যনীয়। ঐ ম্যাসেজগুলোর মূল কথাই ছিল ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব আর সহযোগিতার আগ্রহ। এমনকি কোন কোন ম্যাসেজে এমনও বলা হয়েছিল যে, ‘‘যদি তোমরা দোকানে-বাজারে যেতে ভয় পাও তবে সংকোচ না করে আমাদেরকে বলো, আমরা করে দেব তোমাদের হাট-বাজার’’।

এই হল জনগণের পাশে জনগণ দেশে দেশে যুগে যুগে, কতিপয় দুষ্কৃতিকারী ও বিভক্তকারী ছাড়া। সাম্প্র্রদায়ীক সম্প্রীতির তুঙ্গ উদাহরণ রেখে গেছেন শিখদের গুরু অর্জুনদেব। আমাদের যেমন কাবা শরীফ ওদের তেমনি অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। গুরু অর্জুনদেব ১৫৮৮ সালে স্বর্ণমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করিয়েছিলেন লাহোর থেকে মুসলিম সুফি শেখ মিয়া মীর-কে ডেকে এনে তাঁরই হাতে। সাম্প্র্রদায়ীক সম্প্রীতির কতবড় বাণী এতে আছে তা কি কল্পনাও করতে পারবে তারা যারা আজ অন্য ধর্মকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন করছে?

ইসরাইল-ফিলিস্তিনের যুদ্ধের জায়গায় যুদ্ধ থাকুক, রাজনীতি থাকুক রাজনীতির জায়গায়। কিন্তু জ্বালাও পোড়াও করে কেউ কোনদিন ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা ঠেকাতে পারবে না। তাহলে আমরা কি করব? দুনিয়ার কেউ কোথাও ঢোলের বাড়ি দিলেই আমরা নেচে উঠব? নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে ছুটতে থাকব? তাহলে তো মজা পেয়ে ওরা আরো ঢোলের বাড়ি দেবে এবং আরো জোরে দেবে। এটা খুবই ঠিক যে ইসলামের প্রতি ব্যঙ্গ হলে আমাদের মনে লাগে। কিন্তু সেই সাথে এটাও ঠিক যে প্রতিবাদের ভাষা প্রতিবাদীর চরিত্র প্রমাণ করে। ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ-সমস্যার শ্বাশ্বত সমাধান শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, শুধু এখনকার জন্য নয়, সর্বকালের সমগ্র মানবজাতির জন্য চোদ্দশ বছর আগে দিয়ে রেখেছেন রসুল ও আল্‌ কোরাণ। আশ্চর্য্য এই যে সেই নির্দেশ ইহুদী-খ্রীষ্টানেরা মেনে চলেছে বলেই ওরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বাইবেলের প্রতি অনেক ব্যঙ্গ হয়েছে, এমনকি নিউইয়র্কে বোতলের মধ্যে প্রস্রাবের ভেতর যীশুর মুর্তি প্রদর্শনের মত ভয়াবহ ব্যঙ্গ হয়েছিল। কোটি কোটি খ্রীষ্টান কষ্ট পেয়েছে কিন্তু যেহেতু কোথাও কোনো হিংস্রতা হয়নি বলে ওটা ওখানেই মরে গেছে। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম থাকবেই, কিন্তু সাধারণভাবে আমাদের প্রতিও ব্যঙ্গ মরে যাবে যদি আমরা রসুলের মিষ্টি খাওয়ার উদাহরণ অনুসরণ করি যা ওপরে বলেছি, অন্য ধর্মের প্রতি ব্যঙ্গ বন্ধ করি। আর যদি পালন করি হুকুমদাতার সুষ্পষ্ট হুকুম -

‘‘কোরাণের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারী করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহ’র আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতিজ্ঞাপন ও বিদ্রূপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না যতক্ষন না তারা প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়’’ - সুরা নিসা আয়াত ১৪০।

যদি আমরা এ হুকুম না মানি তাহলে? ওই আয়াতেই পরের নির্দেশ - ‘‘তা নাহলে তোমরাও তাদেরই মত হয়ে যাবে’’।

হুকুমটা অনেক মুসলমানের পছন্দ নয় - কিন্তু এর চেয়ে উত্তম ও কার্য্যকর উপায় কি হতে পারে তা কেউ বলে দিক। ড্যানিশ কার্টুন নিয়ে ওই হুকুম লংঘন করেই আমাদের জানমালের অনেক ক্ষতি হয়েছে, ইসলামের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে এবং আমরাও ওদের মত হয়ে গেছি।

 

১৫ই সেপ্টেম্বর ৪০ মুক্তিসন (২০১০) 

Print