জামাতে-পিছলামি বনাম জামাতের পিছলামি

Image: Jamate Pislamiছদ্মনামে জামাতকে ব্যঙ্গ করে  বছর বিশেক  আগে "আল ভোঁদড়" জাতীয় ছড়া আর নিবন্ধ লিখতাম,  'জামাতে  পিছলামী ডট কম' ছিল আমার ওয়েবসাইটের নাম ।  বছর দশেক হল ওগুলো বাদ দিয়েছি যখন বুঝেছি ধর্মের ব্যাপারে ব্যঙ্গ করে লাভ নেই। বিতর্কেও লাভ নেই কারণ বিতর্ক হল বাকযুদ্ধ, -  যুদ্ধে প্রথম নিহত হয় সত্য।  তার চেয়ে আলাপ আলোচনা ভালো, কেউ মানলে ভালো না মানলে লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন।  যাহোক জামাতে-পিছলামী বন্ধ করেছি কিন্তু ওদিকে  প্রবলবেগে চলছে জামাতের নানা রকম পিছলামী।  আলোচনার আহ্বান থেকে পিছলিয়ে যাওয়া জামাতের বৈশিষ্ট্য।  


(1) জামাত দেশে একটা বড় পরিবর্তন আনতে চায়।  ভালো !!   কিন্তু দেশটা যেহেতু  জামাতের বাপের সম্পত্তি নয় তাই এ ব্যাপারে আলোচনার  অধিকার আমাদের আছে এবং সে আলোচনা করতে জামাত আইনগত না হলেও নীতিগতভাবে বাধ্য।  জামাতের মৌদুদীবাদ কোরান-রসুল ও মানবাধিকারের প্রতি কি মারাত্মক  বিশ্বাসঘাতকতা তা তো আমি দলিল ধরে ধরে জানি।  জাতিকে এ দলিলগুলো জানানো দরকার, তাই আমি  জামাতের ওয়েবসাইটে যে কন্ট্যাক্ট ঠিকানা আছে তাতে বছর দশেক আগে অন্তত: ১০টা চিঠি দিলাম -  আসুন ভিডিও ক্যামেরার সামনে আলোচনা করি যাতে জাতি তা দেখতে পারে, একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।  কারো কোনো ভুল থাকলে এ আলোচনায় সেটা শুধরে নেয়ার সুযোগ হবে, জাতিও এ ব্যাপারে শিক্ষিত হবে। পিছ্লিয়ে গেল জামাত।


(2) তারপর ভাবলাম নিউইয়র্কের বাংলা সাপ্তাহিকে বিজ্ঞাপনে আলোচনার ডাক দেয়া যাক।  এক  বন্ধুকে চেপে ধরাতে সে নিজের  টাকায় অর্ধেক পৃষ্ঠার ঢাউস বিজ্ঞাপন দিল।  নিউইয়র্ক  জুড়ে তো জামাতিরা  কিলবিল করছে, খবরটা নিশ্চয় পৌঁছেছে।  কিন্তু জামাত  পিছলিয়ে গেল এবারও।  গুরুর খাসলত শিষ্য তো পাবেই,  মৌদুদীও নাকি তাই করতেন।  ১৯৬৭ সালে একদিন এক জামাতি-শিষ্য মৌদুদীকে বলেছিল মাওলানা গোলাম গাউস হাজরাভি মৌদুদীর সমালোচনা করেছেন - কিন্তু মৌদুদী নীরব কেন। মৌদুদী সেই মওলানার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন -  "তোমাদের রাগেই তোমরা  মর"  ("ইসলামী দল ও নেতৃবৃন্দের প্রতি জামায়াতের নীতি"- গোলাম আজম - ইনকিলাব ০৪ জানুয়ারী ২০০৬)।  বড়ই  পিছলা নেতা !!  দেশে পরিবর্তন আনতে চান কিন্তু সমালোচনার জবাব না দিয়ে পিছলিয়ে যাবেন!  সেই জামাতই গায়ে পড়ে পোপ-কে চিঠি দিয়েছে-“মুসলমান ও খৃস্টানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তুলতে আন্ত:ধর্মীয় সংলাপ খুবই প্রয়োজন” সংগ্রাম ১৭ই অক্টোবর ২০০৭। পিছলামী আর কাকে বলে-এ ব্যাপারে সংলাপের নাকি কোন বিকল্প নেই।  পোপ বোধ হয় সে চিঠি পড়েও দেখেননি কারণ আলোচনার কোনো খবর আমরা পাইনি। {কানে কানে বলে রাখি জামাত আজ যতই উল্টা মারুক গো-আজম কিন্তু শেখ মুজিবকে সরাসরি "জাতির পিতা" বলেছেন - ("জীবনে যা দেখলাম"-  সংগ্রাম  ১৯ ডিসেম্বর ২০০৮)}। 


(3) দল হিসেবে জামাত করুক না করুক জামাতি-তত্বে বিশ্বাসী লোকেরাও এতই পিচ্ছিল যে হাতে ছাই মেখেও তাঁদের ধরা মুশকিল। এমন এক ডাক্তার শারীরিক থাকেন লণ্ডনে, মানসিক থাকেন ধর্মীয় উন্মাদনার এক হিংস্র অবাস্তব দেশে। সেকুলার দেশের সম্পদ-সিস্টেম উপভোগ করেন আর সেকুলারিজম ধ্বংসের গর্জন করেন।  প্রায়ই জামাতি পত্রিকায় ঢাউস নিবন্ধে ডন কুইক্সোট-এর মত হুহুঙ্কারে বাতাসে জিহাদের তরোয়াল ঘোরান।  কোত্থেকে আমার ইমেইল জোগাড় করেছিলেন, কিছুদিন পাঠিয়েছিলেন লিংক। লণ্ডনে আমার ক্লাসফ্রেন্ডরা থাকে, মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে যাই। ডাক্তারকে ইমেইল করলাম, “আসুন ভিডিও ক্যামেরার সামনে চায়ের কাপ হাতে একটু বসি”। ডাক্তার নিশ্চুপে পিছলিয়ে গেলেন।    


(4) পশ্চিমা বিশ্বে সর্বপ্রথম দেশের আইন-সমর্থিত শারিয়া কোর্ট ১৪ বছর চলেছিল ক্যানাডার টরন্টো-তে। জানতে পেরে ইমেইল করলাম, "শরিয়ায় সমস্যা আছে, আলোচনা করতে চাই"।  জবাব এল- "নিশ্চয়ই, শিগগিরই জানাচ্ছি"। তারপর পিছলিয়ে গেলেন, সেই শিগগির কোনকালেই আসেনি। আড়াই বছর উথাল-পাথাল ধ্বস্তাধ্বস্তির পর ১৪ বছর ধরে চলে আসা সেই কোর্ট আমরা চিরতরে উচ্ছেদ করেছি।    


(5) সেই কোর্টের ঘোর সমর্থক চণ্ডমূর্তি ক্যানাডা'র আল আজহারী মওলানা। তখন আমার প্রধান কাজ ছিল টেলিভিশনে জাতির সামনে শারিয়া আইনগুলো তুলে ধরা ও শারিয়া-পন্থীদের আলোচনায় আহ্বান করা। বিস্তর সাধাসাধির পরে মওলানা এলেন টিভি-অনুষ্ঠানে।  কিন্তু আধ ঘন্টায় কতটুকুই বা হয় তাই বললাম ভিডিও ষ্টুডিওতে দু'জন কেতাব পত্র নিয়ে বসি দু-তিন ঘন্টার জন্য। তিনি রাজী হলেন, আমি ষ্টুডিও ভাড়া করলাম। রেকর্ডিং-এর দিনে তিনি পিছলিয়ে গেলেন - বেমালুম লাপাত্তা, তাঁর মোবাইলও বন্ধ। নষ্ট হল আমার টাকাগুলো।  পরে কোনোদিনও তিনি ফোনে বা ইমেইল-এ আমাকে স্যরি বা কিচ্ছু বলেন নি।  হায়রে শারিয়া-সমর্থক ! 


(6) পরাক্রমশালী  মেধাবী আইন-বিশেষজ্ঞ, অনেক দেশ বিদেশ মহাদেশ করেছেন। পুলকিত হলাম এত হাই প্রোফাইল পণ্ডিত ব্যস্ততার মধ্যে শারিয়া'র ওপরে আমার "ডিভাইন স্টোন" (নারী) মুভিটা দেখে সমালোচনা পোষ্ট করেছেন।   কিন্তু অবাক হলাম - শারিয়া নিয়ে কথা সেখানে আমি শত শত বইয়ের হাজার হাজার পৃষ্ঠার মূল হানাফি, শাফি ও অন্যান্য শারিয়া কেতাব, কোরানের তফসির থেকে আইন নম্বর আর পৃষ্ঠা ধরে ধরে দেখিয়েছি আর উনি কম্পিউটার স্ক্রীন-এর সামনে ক্যামেরা ধরে গুগল মেরেছেন । ওটা না করে বা শারিয়া-অনভিজ্ঞ লোকদের উদ্ধৃতি না দিয়ে নিজের প্রজ্ঞা প্রয়োগ করলে আমার লাভ হত।  মুভিতে সুত্র ধরে ধরে দেখানো আছে "এই এই শারিয়া আইন মোতাবেক খুন, জখম, চুরি ডাকাতি পরকীয়া মদ্যপান (হুদুদ ও কিসাস) মামলায় নারীসাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়"।  তার পরেই মুভিতে আছে- " কোরান-রসুল এসব মামলায় কখনো নারীসাক্ষ্য  বাতিল করেন নি"। এটা তো প্রো-ইসলাম হল, আমি কোরান-রসুলের পক্ষেই মুভিটা বানিয়েছি এত পরিশ্রম এত খরচ করে।  কেন এটা তাঁর কাছে ইসলাম-বিরোধী মনে হল জানলে সেটা মেরামত করব ভেবে ফেসবুকে অনুরোধ পাঠালাম আলোচনার জন্য।  সরাসরি "না" বলে দিলেন তিনি। নিশ্চুপে পিছলিয়ে যাবার চেয়ে সেটা বরং অনেক ভালো। বাই দি ওয়ে, সৌদি আরবে মালিকি শরিয়া চলে না, চলে হাম্বলী শরিয়া।


(7) এবারে জামাতের অঘোষিত  তত্ত্বগুরু শাহ আব্দুল হান্নান।  মন্ত্রনালয়ের প্রাক্তন সেক্রেটারী, ইসলামী ব্যাংক-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান।  বহু আগে থেকেই ইয়াহুগ্রুপে আদবের সাথে তর্ক করেছি, দুএকবার তিনি কিঞ্চিৎ ফাউল কথা বলেছেন আমি সহ্য করে গেছি কারণ তিনি বর্ষীয়ান সম্মানিত মানুষ।  বিস্তারিত আলোচনায় এসেছিলেন মাত্র একবারই। উনি দাবী করছিলেন জামাত গণতান্ত্রিক দল, আমি দাবী করছিলাম গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে জামাত পৃথিবীতে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। উনি দিচ্ছিলেন ব্যক্তিগত মতামত, আমি দিচ্ছিলাম  দলিলের উদ্ধৃতি। ওটা পাওয়া যাবে এখানে:-    

জামাত আমাদের সাথে আলোচনা এড়িয়ে যায় কারণ সে বোঝে তা করলে ইসলাম ও মানবাধিকারের প্রতি তার বিশ্বাসঘাতকতা জনগনের সামনে প্রমাণ হয়ে যাবে।  জনগনকে অন্ধকারে রেখেই সে বেঁচে থাকে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?  জামাত ইতিহাসের পরাজিত শক্তি, ঘড়ির কাঁটা পেছনে ঘোরানোর শক্তি তার নেই। সময় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, আমাদের সামনে না আসুক সময়ের সম্মুখীন তাকে হতেই হবে।

 

হাসান মাহমুদ 

০৯ই আগষ্ট ৪৩ মুক্তিসন (২০১৩)

 


 

Print