• Home
  • Articles
  • Islamic :: Bangla
  • PEW জরীপ - বাংলাদেশের শরিয়াকরণ - ১০নং মহাবিপদ সংকেত?

অনেক ধন্যবাদ, চট্টগ্রামের আহমদ শফি!

হাসান মাহমুদ

১০ জুলাই ৪৩ মুক্তিসন (২০১৩)


Image: Ahmed Shafiহাটহাজারী আলজমিয়াতুল আহলিয়া উলুম মাদ্রাসার পরিচালক, কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ও হেফাজত-এ ইসলাম বাংলাদেশের আমীর জনাব আহমদ শফি, নারীদের নিয়ে আপনার সাম্প্রতিক ভিডিও'র জন্য আপনাকে হৃদয়ের গভীর থেকে অজস্র ধন্যবাদ। কেন তা পরে বলছি। আপনি জাতিকে উপদেশ দিয়েছেন মেয়েদের ৪/৫ ক্লাসের বেশী না পড়াতে, সর্বদা ঘরে থাকতে, এমনকি জিনিসপত্র কিনতেও বাইরে না যেতে। বলেছেন গার্মেন্ট-নারীরা জ্বেনা করে উপার্জন করে, নারীরা তেঁতুলের মত যা দেখলেই পুরুষের মুখে লালা পড়ে। বলেছেন স্ত্রীদের আল্লাহ "বাদশা" বানিয়েছেন, তারা শুধু স্বামী-পুত্রকে "অর্ডার" করবে আর তারা তা করবে। এছাড়া আরো যা বলেছেন তা উল্লেখ করতে রুচিতে বাধছে। নারীদের নাকি ২২ তাল। তা সেটা ত্রিতাল না আদ্ধা, চৌতাল না ঝাঁপতাল তা বলেন নি।

শুনুন, জনাব শফি। আপনার বক্তব্য ইংরেজীতে অনুবাদ হয়ে বিশ্বময় ছড়িয়েছে। আপনি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর গর্তে বাস করেন, এদিকে বিস্তীর্ণ পশ্চিমা বিশ্বে আমাদেরকে ইসলাম-বিরোধীদের ঠ্যালা সামলাতে হয়। আমরা যতই দাবী করি ইসলাম শান্তির ধর্ম, নারী-বান্ধব ধর্ম, আপনি এবং আপনার মত মোল্লারা আমাদেরকে শক্তি না দিয়ে ওদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। এখন ওরা বলছে ফুউহ !! তুমি কে হে বাপু? ওই যে বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাদ্রাসার পরিচালক শিক্ষক, বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামের আমীর আহমদ শফি এই সব নোংরা, হিংস্র কথা বলেছেন- ওটাই হল ইসলাম এবং ওটা মানব-সভ্যতা মানবাধিকারের বিরুদ্ধে একটা কালনাগিনী।

কি জবাব দেব ওদের?

পারমাণবিক শক্তি দিয়ে মেধাবী যাঁরা বিদ্যুত উৎপন্ন করার পদ্ধতি আবিস্কার করেন তাঁরা বৈজ্ঞানিক। ওই শক্তি দিয়ে মেধাবী যাঁরা গণহত্যার জন্য পারমাণবিক বোমা বানানোর পদ্ধতি আবিস্কার করেন তাঁরা বৈজ্ঞানিক নন, তাঁরা রাক্ষস। ঠিক তেমনি, কোরান-রসুল থেকে যাঁরা তুলে আনেন মানুষের মঙ্গল তাঁরাই সত্যিকার আলেম, মাওলানা ও ইসলামের পতাকাবাহী। আর যাঁরা কোরান-রসুল থেকে তুলে আনেন মানুষের অমঙ্গল ও নারীর ওপরে অত্যাচার তাঁরা আলমের ছদ্মবেশে রাক্ষস। নারীর ওপরে অত্যাচারের মধ্যে তাঁরা দেখেন সওয়াব, খোঁজেন বেহেশত। কোরাণ কোরাণ বলে মুখে ফ্যানা তুলে কাজে তাঁরা প্রয়োগ করেন হাদিস। তাও, কোরান-বান্ধব হাদিস প্রয়োগ করেন না, - করেন কোরান বিরোধী নারী-বিরোধী হাদিস। এই প্রচণ্ড ইসলাম-বিরোধী নিষ্ঠুরতার কয়েকশ' উদাহরণ দিয়েছি আমার বই "শরিয়া কি বলে, আমরা কি করি"-তে, এখানে একটা দিচ্ছি। বৌ-পেটানোর মত অমানবিক সন্ত্রাসকে তাঁরা হালাল করেছেন কোরানের (নিসা ৩৪) বিকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠা করে আর এই ধরণের নারী-বিরোধী হাদিস দিয়ে - রোজ হাশরে কোনো স্বামীকে নাকি জিজ্ঞাসা করা হবে না কেন সে এই দুনিয়ায় বৌকে পিটিয়েছিল - সুনান আবু দাউদ, ২১৪২। নবীজী নাকি বলেছেন। অর্থাৎ যত ইচ্ছে বৌ পেটাও, কোনো সমস্যা নেই। এটাই তাঁদের ইসলাম। আমাদের ইসলাম সম্পূর্ণ আলাদা ও নারী-বান্ধব। আমরা জাতিকে জানাই সহি মুসলিমে নবীজীর সুস্পষ্ট ও কঠিন নির্দেশ দেয়া আছে, "বৌকে পেটাবে না". আমি এখানে টাইপ না করে মূল কেতাব থেকে কপি-পেষ্ট করছি:-

Book 11, Number 2138: Narrated Mu'awiyah ibn Haydah: I said: Apostle of Allah, how should we approach our wives and how should we leave them? He replied: Approach your tilth when or how you will, give her (your wife) food when you take food, clothe when you clothe yourself, do not revile her face, and DO NOT BEAT HER (emphasis mine).

Book 11, Number 2139:Narrated Mu'awiyah al−Qushayri: I went to the Apostle of Allah peace_be_upon_him) and asked him: What do you say (command) about our wives? He replied: Give them food what you have for yourself, and clothe them by which you clothe yourself, and DO NOT BEAT THEM (emphasis mine), and do not revile them.

তাহলে? এ ব্যাপারে বিদায় হজ্বের বক্তৃতায় নবীজী কি হুকুম করেছেন সেটাও তাঁরা কখনোই জাতিকে জানতে দেন না - "তাহাদের (স্ত্রীদের) উচিত নয় তোমরা যাহাকে পছন্দ করনা তাহাকে নিজের বিছানায় বসায় - তাহা করিলে প্রহার করিতে পার কিন্তু মৃদুভাবে" - "they should not allow anyone to sit on your bed whom you do not like. But if they do that, you can chastise them but not severely”.- সহি মুসলিম ৭ম খণ্ড ২৮০৩, সহি ইবনে মাজাহ ৪র্থ খণ্ড ৩০৭৮ ইত্যাদি। অনেক ইসলামী বিশেষজ্ঞ "বিছানায় বসা"-র অর্থ করেছেন পরকীয়া। অর্থাৎ নবীজী হুকুম করেছেন – “পরকীয়া ব্যভিচার না করা পর্য্যন্ত বৌয়ের গায়ে হাত তুলবে না”। বউ পরকীয়া করলে জামাই তাকে পেটাবেই - গ্রন্থে যাই লেখা থাক না কেন। পরকীয়াই হোক বা "বিছানায় বসা"-ই হোক ওটা ছাড়া অন্য কোনো কারণে বৌযের গায়ে হাত তোলা নাজায়েজ; নানা রকম কুযুক্তি কূটতর্কে সেটা জায়েজ করে রসুলের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেন তাঁরা । পুরুষ নারীর ওপরে কর্তা, তাই না? কারণ আল্লাহ পুরুষকে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ করেছেন, তাই না? কারণ পুরুষের গায়ে শক্তি বেশী, তাই না? তাহলে তো আশরাফুল মাখলুকাত, সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি হতে হয় গণ্ডার বা হাতীকে! নবীজী দোজখে বেশীর ভাগ নারী দেখেছেন, তাই না? হুমম। বেহেশত-দোজখে তো আমরা যাবো কেয়ামতের পরে হাশরের বিচারের পরে। ওই মেয়েগুলো দোজখে চলে গেল তার মানে কেয়ামত হয়ে গেছে? কবে হল? হয়ে গেছে রোজ হাশরের বিচার? কবে হল? বলুন, মিষ্টার শফি?

অন্যান্য শিক্ষায় বড় সার্টিফিকেট হাসিল করলেই তাকে সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলা যায়। কিন্তু ইসলামে তা নয়। ডিগ্রী থাকুক বা না থাকুক, যিনি কোরান-রসুল থেকে মানুষের মঙ্গল তুলে আনতে পারবেন তিনিই আসল আলেম, আসল মাওলানা। অতীত বর্তমানে বিশ্ব-মুসলিমের অনেক ক্ষতি করেছেন অনেক ডিগ্রীধারী তথাকথিত মাওলানা। উদাহরণ? দিচ্ছি। বড়পীরের মতো দরবেশকে এক হাজার মাওলানা কাফের ফতোয়ায় স্বাক্ষর করেছিল ইমাম হৌজ-এর নেতৃত্বে-(মুখবন্ধ –ফতহুল.গযব,-তাঁর.বক্তৃতার.সংকলন)।এজন্যই রসুল বলেছিলেন-উম্মতের জন্য তাঁর "সর্বাপেক্ষা গভীর উদ্বেগ পথভ্রষ্টকারী আলেমদের নিয়া"-সহি ইবনে মাজাহ ৫ম খণ্ড ৩৯৫২। এটাও দেখুন:-"এ সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফে সানী মাকতুবাত গ্রন্থে লিখেছেন যে, জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তি একবার অভিশপ্ত ইবলিসকে দেখতে পায় যে, সে একেবারে খোশ মেজাজে ও বেকার বসে আছে। ঐ বুযুর্গ ব্যক্তি ইবলিসকে তার এহেন বেকার বসে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে প্রত্যুত্তরে সে বলে যে, বর্তমান সময়ের আলেম সমাজ আমাদের কাজ সমাধা করছে, জনগণকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারাই যথেষ্ট –সংগ্রাম-০৩-জুন-২০১৩"। আপনি ইবলিশের হয়ে কাজ করছেন, রসুলের "সর্বাপেক্ষা গভীর উদ্বেগ" আপনাকে নিয়ে।

কিছু ব্যতিক্রম সব সমাজেই আছে, আপনাদের অনেক মাদ্রাসাতেও আছে কিন্তু সাধারণভাবে আমাদের নারীরা অত্যন্ত মেধাবী, সক্ষম, দক্ষ ও শালীন। অর্থনীতি সহ দেশের সর্বক্ষেত্রে তাঁরা অসামান্য অবদান রাখছেন, তাঁরা আপনাদের মতো যাকাতের টাকায় চলেন না বরং তাঁদের উপার্জনের ট্যাক্স ও যাকাত দিয়ে আপনাদের চলতে হয়। তাঁরা আপনার চেয়ে কম মুসলমান নন। আল্লাহ ও তাঁদের মধ্যে কোনো দালালের দরকারও নেই ইসলামে সে সুযোগও নেই। আপনি তাঁদের যথেষ্ট অপমান করেছেন; আপনি অপমান করেছেন পুরুষদেরও। আপনি সব পুরুষদের কামুক জন্তু বানিয়ে ছেড়েছেন। এতো সাহস, এতো স্পর্ধা আপনার কি করে হলো? আপনার ইসলাম আপনাকে এই শিখিয়েছে? আপনি দুনিয়া দেখেন নি, আপনি কিছুই জানেন না। আমরা নারী-পুরুষ একসাথে পড়াশুনা করেছি, একসাথে চাকরী করছি -আপনার মাথায় সবসময় যে নোংরা পোকাগুলো নড়াচড়া করে সেহুলো আমাদের মাথায় নেই। আমাদের কাছে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের দেয়া কোরানের- রসুলের নারী-বান্ধব ব্যাখ্যা ও হাদিস আছে।

এবারে বলছি কেন আপনাকে ধন্যবাদ। ইসলামের যে ব্যাখ্যা আপনারা বয়ে বেড়ান সেটা যে কতো নোংরা ও নিষ্ঠুর তা দলিল ধরে ধরে দশ পনের বছর ধরে আমরা জাতিকে জানাতে চেষ্টা করছি। কাজটা কঠিন, সাফল্য আমাদের বেশী নয় কিন্তু কাজ এগোচ্ছে। আপনি সেটাই করে দিলেন এক লহমায়; ইসলামের নামে আপনাদের লুকিয়ে রাখা রাক্ষসের চেহারাটা দেখে আতংকে আঁৎকে উঠছে জাতি। আমাদের কাজ সহজ হয়ে গেল কিছুটা হলেও।  

Print