• Home
  • Articles
  • Islamic :: Bangla
  • ক্রিমিন্যালস অফ ইসলাম - (ইসলামের অপরাধীরা) - ড. শাব্বির আহমেদ

নিউজিল্যান্ড: প্রতিশোধের করাত-চক্র ও ‘বিদায় হজ’ এর ভাষণ

নিহত ওমর ফারুকের লাশ 1

পর্বত-অরণ্য মরু-সমুদ্র, পশু-পাখি, মাছ মাছালি-গাছ গাছালির এই শতরূপে অপরূপা গ্রহে মানুষ চিরকাল কষ্ট পেয়েছে বন্যা, খরায়, ভূমিকম্প-সাইক্লোনে, রোগে শোকে। কিন্তু মানুষের হাতেই মানুষ যে কষ্ট পেয়েছে তা অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়। লক্ষ কোটি নিহতের বীভৎস মৃতদেহ, সংখ্যাহীন বিধবা-এতিমের আর্তনাদ হাহাকার, কোটি কোটি দগ্ধ-ধ্বংস বসতির দুঃসহ স্মৃতি বুকে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে মানুষের ইতিহাস।

এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস।  এখন ‘ইসলাম-ভীতি’, ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসী’, ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’,  ‘ইউজফুল ইডিয়টস’, ‘ইসলামের শত্রু’, ‘ইসলাম বাঁচানেওয়ালা’, ‘রাইট ও লেফট উইং’… উথাল-পাথাল দুনিয়া।  কোনটা মিথ্যে- কোনটা সত্যি, কোন সত্যির মধ্যে কী কী ভেজাল, কোন পক্ষের কে ও কারা কী মুখোশ পরে সামনে পেছনে কী মতলবে কী করছে তা বুঝে ওঠা অসম্ভব। এই ধরনের সন্ত্রাস আগে ছিল স্থান কালে সীমাবদ্ধ। এখন অরক্ষিত প্রতিটি দেশে প্রতিটি মানুষ তাদের বাড়ি বা হোটেল-দালানে, মিউজিক কনসার্টে, স্টেডিয়ামে, শিক্ষাঙ্গনে, রাস্তা-ঘাটে এমনকি উপাসনালয়েও।  কেউ জানেনা হঠাৎ কখন কোথায় নিরীহ মানুষের ওপরে উঠে পড়বে ঘাতক ট্রাক বা ছুটে আসবে ঘাতক বুলেট।  এই দাবানল কি আদৌ বন্ধ হবে?  নাকি শান্তির সময়টুকু আসলে পরের রক্তপাতের প্রস্তুতির সময় মাত্র?

সমস্যাটা অতিকায় এবং বহুমাত্রিক।  মাঠে দৃশ্য-অদৃশ্য খেলোয়াড়ের দল, টেবিলে দৃশ্য-অদৃশ্য তাসের ধুম্রপাহাড়, আকাশে বাতাসে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ঘূর্ণিঝড়। সেই সাথে মিডিয়ার তেলেসমাতি তো আছেই। ওদিকে আবার ইসলামিক স্টেট্ মুসলিম সন্ত্রাসীদের কিছু হামলার দায় স্বীকার করাতে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ভীতি বেড়েছে।   বিশ্ব-মুসলিম নেতৃবৃন্দ বলেছেন ওটা ইসলাম নয় ওরা মুসলিম নয় কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি।  ধোঁয়াশার এই উৎকণ্ঠায় একটুখানি স্বস্তির হাওয়া – নিউজিল্যান্ড পার্লামেন্টে কোরান তেলাওয়াত, প্রধানমন্ত্রীর মাথায় হিজাব, সংসদে তড়িৎগতিতে অস্ত্র-আইন পাশ, দু’মিনিটের জন্য নীরব পুরো দেশ, রেডিও-টিভিতে জোহরের আজান, সন্ধ্যায় পার্কে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা, দেশ জুড়ে পশ্চিমা হিজাবী নারীরা, দেশে দেশে অমুসলিমরা মুসল্লিদের নামাজ পাহারা ইত্যাদি ইত্যাদি…।

স্যালিউট ! কিন্তু  !!!

এখানে এসেই আত্মসমালোচনা করাটা কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।  দেশ-বিদেশের বহু মওলানার বক্তব্যে কাউকে উল্লেখ করতে শুনলাম না মুসলিম সন্ত্রাসীদের হাতে পশ্চিমা বিশ্বে আহত-নিহতদের প্রতি সমবেদনা, নাইজিরিয়া মিসর ইন্দোনেশিয়ায় শত শত চার্চ ভাঙা ও হাজার হাজার খ্ৰিস্টানদের হত্যা, সৌদির আক্রমণে ইয়েমেনের কোটি মানুষের ভয়াবহ ধ্বংস, দুর্ভিক্ষে অসংখ্য শিশুর আসন্ন মৃত্যু। বাংলাদেশেও অমুসলিমদের ওপর শত শত অত্যাচার, সম্পত্তি উপাসনালয় ভাঙা হয়েছে কিন্তু  সমবেদনায় ছুটে যাননি কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতা। সভ্য-অসভ্যের এই লক্ষ্মণরেখা দুনিয়ার নাকের ডগায় তুলে ধরা আছে তা আমরা মুখে বলি বা না বলি।

অনেক দেশে সন্ত্রাসীরা ধরা পড়েছে এবং আদালতে আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হয়েছে, হচ্ছে, হবে।  আত্মসমালোচনায় এসে পড়ে সংশ্লিষ্ট শারিয়া আইনটাও।  আইনটা এতই সুস্পষ্ট যে তার মধ্যে “এর মানে ওই আর ওর মানে তাই” করে পানি ঘোলা করার সুযোগ নেই।  উদ্ধৃতি দিচ্ছি বাংলাদেশ ইসলামী ফাউণ্ডেশনের প্রকাশিত ৩ খণ্ডের “বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন” থেকে, কেউ চাইলে পৃষ্ঠাগুলোর স্ক্যান পাঠাব।

১. “যে কোন কর্মের বাস্তব সংঘটনই উহাকে অপরাধকর্মে পরিণত করে… বাস্তবে সংঘটিত না হওয়া পর্যন্ত কোন কর্মের জন্য কাহাকেও দায়ী করা যায় না।” – ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ২০৮।

২. “কোন ব্যক্তির অপরাধ প্রকাশ্য আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাহাকে গ্রেপ্তার বা আটকের মাধ্যমে তাহার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাইবে না।” – ৩য় খণ্ড ধারা ১২৮২।

অর্থাৎ সন্ত্রাসীদের প্ল্যান, মিটিং, যোগাযোগ, ষড়যন্ত্র, অস্ত্র জোগাড় ইত্যাদি প্রমাণিত হলেও তাদেরকে গ্রেপ্তার করা যাবে শুধু “বাস্তবে সংঘটিত” অর্থাৎ খুন হবার পরেই, আগে নয়।   এসব আইন দিয়ে কাজ হবে?  এক’শ বছর আগেও প্রতিশোধপরায়ণতার হিংস্র দানব মোটামুটি বন্ধ ছিল বোতলে,  এখন স্বার্থের কারণে তাকে ছিপি খুলে মুক্ত করেছেন বিশ্বনেতারা।  রক্তপিপাসু সে দানব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বময়, এখন ইচ্ছে করলেও তাকে তারা আবার বোতলে ছিপিবন্ধ  করতে পারবেন না।  মানুষের রক্তে প্রবাহিত ষড়রিপু (ছয় শত্রু) – কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য – এই তালিকায় যোগ হয়েছে আরেক মারাত্মক শত্রু – প্রতিশোধপরায়ণতা।

প্রতিটি সন্ত্রাসের পর আহত-নিহতদের জন্য বিশ্বের বিশ্বের সাধারণ মানুষের অশ্রু ঝরেছে, সমবেদনার সাগর বয়েছে কিন্তু অক্ষত রয়ে গেছে প্রতিশোধ-চক্র। নিউজিল্যান্ড গণহত্যার কদিনের মধ্যেই হল্যান্ডে মুসলিম গোকমেন তানিস খুন করেছে তিনজন অমুসলিমকে।  হল্যান্ডের পরেই ক্যালিফোর্নিয়ায় মসজিদে আগুন দিয়েছে কেউ, ডেনমার্কে প্রকাশ্যে কোরান পুড়িয়েছে একজন। সবারই মাথায় একই আগুন – “প্রতিশোধ”!  এখানেই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞেরা আজ অসহায়।  আগে সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্ল্যান করত, মিটিং, ইমেইল, টেলিফোন ফেসবুক ইত্যাদি ট্র্যাক করে তাদের ধরা যেত।  এখন সন্ত্রাসী একাই প্ল্যান ও সন্ত্রাস করছে।  তাই তাকে চিহ্নিত করা কঠিন।  ট্যারেন্ট একাই দীর্ঘ দুইটি বছর ধরে এই হামলার প্ল্যান করেছে, তার কোনো দল লাগেনি, লাগেনি অর্থায়ন বা কোনো “সহযোদ্ধা”। কে জানে হয়তো এখনো “প্রতিশোধ” নিতে গোপনে একা তৈরি হচ্ছে অন্য কোনো ট্যারেন্ট, রহমত আলিকভ বা তানিস!  প্রতিশোধ-চক্রটা এরকম:-

** ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ২০১৭ সালে স্টকহোমের সন্ত্রাসী রহমত আলিকভ-এর হামলায় নিহতদের প্রতিশোধ নিতে নিউজিল্যাণ্ডে মানুষ খুন করেছে।

** ১০১৭ সালে রহমত আলিকভ আগের সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে স্টকহোমে মানুষ খুন করেছে।

** তার আগের সন্ত্রাসীরাও তাদের আগের সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে মানুষ খুন করেছে।

** এর পরে যদি আবার হামলা হয়, এবং না হবার কোনও কারণ নেই, তবে সেই সন্ত্রাসীরাও আগের সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে মানুষ খুন করবে।

 হায় ! ব্রেন্টন ট্যারেন্ট কোনোদিন জানবেনা, স্টকহোমের যে সন্ত্রাসী রহমত আলিকভ-এর হামলায় নিহতদের প্রতিশোধ নিতে নিউজিল্যাণ্ডে সে মানুষ খুন করেছে, তার নিজের হাতে আহত-নিহত মুসলিমেরা রহমত আলিকভকে তার মতোই ঘৃণা করেছে। রহমত আলিকভ কোনোদিনই জানবেনা যেই সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে সে মানুষ খুন করেছে, তার হাতে আহত-নিহতেরা সেই সন্ত্রাসকে তার মতোই ঘৃণা করেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক  ইনফরমেশন গ্যাপ এটা, এর শেষ কোথায়?  প্রতিশোধের এই করাত-চক্র কি অনন্তকাল ধরে এখানে ওখানে এদেশে ওদেশে ছিন্নভিন্ন করতেই থাকবে সাধারণ মানুষের দেহ?  এ অভিশাপ থেকে পরিত্রাণের কি কোনোই উপায় নেই?

আছে। বহু শতাব্দী আগে ছিল একই রকম অন্তহীন প্রতিশোধ-চক্র। তোমার দলের কেউ একজন আমার দলের কেউ একজনকে খুন করেছিল, তাই এখন আমিও তোমার দলের যতজনকে পাব খুন করব। এই চক্রে খুন হয়েছে কত শত মানুষ কত শত যুগ ধরে।  তারপর এক মাহেন্দ্রক্ষণে খানখান হয়ে ভেঙে পড়েছিল বহু শতাব্দীর সেই অভিশপ্ত প্রতিশোধ-চক্র, মানুষ বেরিয়ে এসেছিল অন্তহীন প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে। এখনো মহাকালের ওপার হতে অস্ফুটকণ্ঠে ভেসে আসছে সেই বুলন্দ ঘোষণা, কেউ শুনবে কি?

“জাহিলি যুগের সকল রক্তের দাবি রহিত করা হইল। সর্বপ্রথম আমি রবিয়া ইবনে হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের শিশুপুত্রের রক্তের দাবি রহিত করিলাম”- (বিদায় হজ্বের ভাষণ)।

শুধু মুখের কথা নয় বরং নিজেও সেটা পালন করার কঠিন উদাহরণ। মুসলিমদের জন্য এ হুকুম কোনো মুসলিম নেতা পালনের আহ্বান জানান নি। বিশ্ব-মানবের জন্য এটা কার্যকরী বাতিঘর অথচ সে আলো কোনো অমুসলিম নেতা কাজে লাগান নি।

ইতিহাসের ওপার থেকে আজ হয়ত তিনি করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন আমাদের রক্তাক্ত বিশ্বের দিকে।

কি ভাবছেন কে জানে!

ছবি: নিউজিল্যান্ডে জুমার নামাজের সময় সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত ওমর ফারুকের লাশ নারায়ণগঞ্জে এনে দাফন করা হয়েছে।

 

https://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/55989#comment-83736

Commented – 30 Mar 2019:- দীর্ঘদিন অনেক সংগঠনের সাথে কাজ করার পর সম্প্রতি আমি কয়েকটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ছাড়া অন্য সব সংগঠন থেকে অবসর নিয়েছি। এ নিবন্ধের সাথে মতামত-সম্পাদককে লিখেছিলাম লেখক পরিচিতিতে সেটা আপডেট করতে - দেখছি এখনো করা হয়নি। উনারা নিশ্চয় খুব ব্যস্ত থাকেন, পরে হয়তো করবেন। 

Print