ইসলামী শারিয়া : চিরন্তন, নাকি পরিবর্তনযোগ্য ?

ইসলামী শারিয়া : চিরন্তন, নাকি পরিবর্তনযোগ্য ?

সজল রোশনের সাথে ইউটিউব সিরিজ - অনুষ্ঠান # ১৬ - ১৫ই জানুয়ারী ২০২৪  

Youtube:- https://www.youtube.com/watch?v=TdJeJQZBfq4

Facebook - https://www.facebook.com/sajalroshaninc/videos/1546673176144921

Answer - YES, and NO.

ইতিহাস কি বলে ?  খলীফারা কি করেছেন?  স্বয়ং নবীজি কি করেছেন?   সবই দেখব আমরা।

আগের অনুষ্ঠানগুলোর  মতোই, আমি পোষ্ট পিয়নের মতো শুধু তত্বতথ্যের খামটা দিয়ে চলে যাবো - বাকি আপনাদের সিদ্ধান্ত।

গত অনুষ্ঠানে আমরা ইমাম গাজ্জালী থেকে দেখেছি (এহহিয়া উলুমুদ্দীন ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ৫০, ৫১) শুরুতে সাহাবীরা শারিয়া ফিকাহ এগুলোকে আধ্যাত্মিক অর্থে ব্যবহার করতেন যা কোরানের মর্মবাণী ছিল। কিন্তু তিনশো বছর পর তাঁর সময়ে দেখা গেল শারিয়া ফিকাহ এগুলো আধ্যাত্মিকতাহীন রাজনৈতিক হয়ে "মানুষ প্রতারণার জালে আবদ্ধ হচ্ছে"।

শুরু করি মাওলানা মওদুদী দিয়ে।

তিনি তাঁর "ইসলামিক ল এন্ড কনস্টিটিউশন" বইয়ের 140 পৃষ্ঠায় বলেছেন পৃথিবীর সব মুসলিম একসাথে হলেও কোরআন রসুলের সুস্পষ্ট নির্দেশ বিন্দুমাত্র অল্টার অর্থাৎ বদল করতে পারবে না।  এটা দুনিয়ার অনেক মুসলিম বিশ্বাস করেন।

কিন্তু সেই মওদুদীই তাঁর "দি সিক নেশনস অফ দি মডার্ন এজ" পৃষ্ঠা ৮ বলেছেন:-  

একসময় মুসলিমদের কলম ও তলোয়ার “রুলড সুপ্রিম” - সর্বোচ্চ শাসক ছিল - কিন্তু তাদের পতন হলো কারণ They lost the ability….তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোতে শারিয়াকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলো না। অর্থাৎ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শারিয়াকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

TWO ** - বিধান পরিবর্তনের সমর্থন তিনি এখানেও করেছেন - তাঁর "তাফহিমুল কুরাণ"-এ সূরা মায়েদা ৪৮-এর ব্যাখ্যাতে প্রশ্ন তুলেছেন ইসলাম তো এক কিন্তু তাহলে বিভিন্ন নবীদের কেতাবে ইবাদত, হালাল-হারাম ও সামাজিক বিধি-বিধান আলাদা কেন?

তিনি  জবাব দিচ্ছেন-  উদ্ধৃতি:-

It is God Himself Who altered the legal prescriptions to suit different nations at different times and in different circumstances.

স্বয়ং আল্লাহ বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন জাতির ও বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াবার জন্য আইনের ধারা বদলেছেন”:-

https://islamicstudies.info/tafheem.php?sura=5&verse=44&to=50

https://www.tafheem.net/

QUESTION:- Why do the religious laws propounded by the various Prophets differ in matters of detail even though the Prophets and their Books preach one and the same religion (din) and even confirm and support each other? Why is it that in regard to the prescribed forms of worship, the regulations concerning what is permitted and what is prohibited, and the detailed legal regulations governing the social and collective life, there is some disagreement among the various laws propounded by the different Prophets and the divine Books?

এর জোরালো সমর্থন আমরা অন্যান্য কিতাবে পাই  - ANOTHER PARENT BOOK –

প্রিন্সিপলস অব্ ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স’ - ডঃ হাশিম কামালি-

“নবী (দঃ)-এর সময়েই কোরান ও সুন্নাহ-তে কিছু সম্পূর্ণ ও কিছু আংশিক পরিবর্তন করা হয়। পরিস্থিতির পরিবর্তনই ইহার মূল কারণ” - পৃষ্ঠা ২০৩।

পরিস্থিতির কারণে বিধান বদলের উদাহরণ অজস্র, কিছু দেখাই :- 

1.      এক্সাম্পল ওয়ান - আমরা কি কখনো ভেবেছিলাম আজান বদলে যাবে?

গেছে তো!

করোনার সময় মসজিদ থেকে “হাইয়ালাস সালাহ” –অর্থাৎ “নামাজের জন্য এসো” বদলে গিয়ে

“আস সালাতু ফিল বুয়ুতিকুম" অর্থাৎ বাসায় নামাজ পড়ো – এই CHANGE টা হয়েছে তো! 

মুসলিম ইতিহাসে এটা বারবার ঘটেছে ।

2.      এক্সাম্পল টু – - ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত হজ্ব প্রায় ৪০ বার বিভিন্ন কারণে হয় একেবারেই বন্ধ বা প্রায় বন্ধ ছিল। ওহাবীদের যুদ্ধের জন্য হজ 1803 - থেকে 1809 প্র্যাকটিক্যালি বন্ধ ছিল - |

 (PARENT BOOK - "দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস" - স্যার উইলিয়াম হান্টার, পৃষ্ঠা ৪৭।    )

কিন্তু তার মানে এই নয় যে পরিস্থিতি বদলে গেলে ইসলামের সবকিছুই বদলে দিতে হবে।

NO – NEVER !

এখানেই  শারিয়া আইনের কনস্ট্যান্ট  ভারসেস ভেরিয়েবলের কথা চলে আসে যার সুস্পষ্ট প্রমাণ সূরা হুজরাত আয়াত ২ – নবীজির সামনে উঁচু গলায় কথা বলবে না - কোরানের এই হুকুম কি আপনি মানতে পারবেন আজ? পারবেন না, মানার সুযোগ নেই।

দেখুন আজ এই মুহূর্তে দুনিয়ায় বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্র

সাংবিধানিকভাবে শারিয়া ভিত্তিক, কিন্তু কই কেউই তো দাসপ্রথা বা জিজিয়া কর চালু করেনি !!

করবেও না। অর্থাৎ প্রমাণ হল কুরআন-সুন্নতের অনেক হুকুমই পরিবর্তনযোগ্য এবং পরিবর্তিত হয়েছে

কিন্তু তাহলে কোন বিধান শাশ্বত  আর কোনটা পরিবর্তনযোগ্য তা কিভাবে বোঝা যাবে?

সেটা নবীজি স্বয়ং এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের বিধান পরিবর্তন থেকে বোঝা যাবে।

** নবী সা'এর এক্সাম্পল IS MOST IMPORTANT !! উনি নিজের বিধান নিজেই একাধিকবার বদলেছেন।

WAIT!

একটা তর্ক আছে যে উনি কি আইনদাতা ছিলেন? আমি বলি হ্যাঁ ছিলেন - সেজন্যই আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে দেয়ালে ইতিহাসের 10 জন আইন দাতার মূর্তির মধ্যে উনারও মূর্তি ছিল যেটা মুসলিমদের আপত্তির মুখে সরিয়ে ফেলা হয়। উনি আইনদাতা ছিলেন যেখানে কোরআন নিরব শুধু সেখানেই -  মদ্যপান তার উদাহরণ।

3.      এক্সাম্পল থ্রি মদ্যপান - কোরআনে শাস্তি নাই নিরুৎসাহিত করা আছে বিশেষ করে বাকারা 219 ।

উনি মাতালের শাস্তি দিয়েছেন (A)  চল্লিশ চাবুক, তারপর সেই মাতাল কখনো (B) দুইবার শাস্তির পর, (C) কখনো তিনবার শাস্তির পর আবার মদ খেলে তিনি মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন এবং (D)  এক পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড রহিতও করেছিলেন – আবু দাউদ ৪৪৬৭, ৪৪৬৯, ৪৪৭০ ।

4.      এক্সাম্পল 4 - নবীজির দেয়া মাতালের শাস্তি চেঞ্জ করে ওমর (র) আশি চাবুক করেন − আবু দাউদ ৪৪৬৬।

5.      এক্সাম্পল 5 -  জিজিয়া’র উল্লেখ আছে মাত্র একটা আয়াতে - সূরা তওবা আয়াত ২৯ - নবী (স) জিজিয়া নিতেন কিন্তু হজরত ওমর (রা:) কিছু ব্যক্তি ও এক গোত্রের কাছ থেকে জিজিয়া নেয়া বন্ধ করেন –

বিস্তারিত - মুহিউদ্দিন খানের অনুদিত বাংলা-কোরান, পৃষ্ঠা ৫৬৭।

একচুয়ালি বিধান বদলের মূলসূত্র কোরআনেই আছে সূরা নাহল ১০১, বাকারা -  ১০৬  - নাসিক-মনসুখ তত্ত্ব, 

এক বিধানকে অন্য বিধান দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা – এ নিয়ে অবশ্য আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে কিন্তু তারপরেও  - এই যে ড. হাশিম কামালীর বিখ্যাত বই প্রিন্সিপল্স্ অব্ ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স"

২০৩ পৃষ্ঠায় উনি বলছেন:- “নখস- এর উপলব্ধি আসিয়াছে মানুষের উপকারের জন্য সমাজের বিদ্যমান

পটভূমি ও আইনের সমন্বয়ের প্রয়োজনে”।

তিনি  ৫০৪ পৃষ্ঠায় বলছেন - “কোরাণ ধীরে ধীরে ২৩ বছর ধরিয়া নাজিল হইয়াছিল, ইহাতে প্রমাণ হয় যে কোরাণ সেই সময়ের পরিবর্তনগুলিকে গণনায় ধরিয়াছিল” ।

6.      এক্সাম্পল 6 - ডঃ হাশিম কামালী, পৃঃ ২০৩ - নবী (দঃ) মুয়ালাফা গোত্রকে জাকাতের যে অংশ দিতেন - সেটা হজরত ওমর (রা:) বন্ধ করে দেন।

7.      এক্সাম্পল  - ডঃ হাশিম কামালী, পৃঃ ৩২৫ - চোরের হাত কাটতে হবে মায়েদা ৩৮। কিন্তু হযরত ওমর (রা:) দুর্ভিক্ষের সময় এটা বন্ধ করেছিলেন।

দেখুন এই যে পাকিস্তানসহ  দুনিয়ায় এতগুলো সাংবিধানিকভাবে শারিয়া-রাষ্ট্রের দু-একটা ছাড়া বাকি রাষ্ট্রগুলো চোরের হাত কাটা বন্ধ করেছে।

8.      এক্সাম্পল 8- মুসলিম পুরুষরা ইহুদি খ্রিস্টান নারীকে বিয়ে করতে পারবে- সূরা মায়েদা ৫ - আল্লাহর দেওয়া অধিকার। কিন্তু হজরত ওমর (রা:) এক সময় এটা বন্ধ করেছিলেন ডঃ কামালী, পৃঃ ৩২৫। 

9.      এক্সাম্পল 9 - জিজিয়া কর নেওয়া হয় অমুসলিমদের কাছ থেকে, মুসলিমদের কাছ থেকে নয়।

কিন্তু হযরত ওমর (রা) কিছু মুসলিমের কাছ থেকে জিজিয়া নিয়েছিলেন তাদেরকে যুদ্ধ থেকে রেহাই দিতে, খ্রিস্টান গোত্র জুরাজিমাহ-এর কাছ থেকে জিজিয়া নেননি কারণ তারা মুসলিমদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করত।

মো. কুতুবের বিখ্যাত বই ‘ইসলাম দ্য মিস্আণ্ডারস্টুড রিলিজিয়ন”, পৃষ্ঠা ২৩৭ ।

10.    এক্সাম্পল 10  -হযরত ওসমান (র)- তামাত্তু হজ্জের পদ্ধতি বদল করলে হযরত আলী রা বলেছিলেন আমি কারো কথায় রসূলের সুন্নত ছাড়বো না”বুখারি ২য় খণ্ড হাদিস ৬৩৪।

11.    এক্সাম্পল 11 - নবী (সাঃ) মৃত্যুকালে নেতা-নির্বাচন জনগণের ওপর ছেড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু হজরত আবুবকর (রা) উনার অনুসরণ না করে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হজরত ওমরকে (রা:)।

12.    এক্সাম্পল  12 - হজরত ওমরও (রা:) ওই দুই পদ্ধতির কোনটাই না করে ছয় সাহাবীর কমিটি বানিয়ে

শেষ দুই উদাহরণ

13.    এক্সাম্পল 13 - উসমানিয়া খলীফা ১৮৩৯ - ১৮৬৯ সাল ধরে "তানজীমাত সংস্কার" আইন প্রণয়ন করে (A) বন্ধ করে দাসপ্রথা (সূরা মুহম্মদ ৪, মুমিনুন ৫, ৬) (B) বন্ধ করে জিজিয়া কর (তওবা ২৯) (C) ব্যভিচার এবং ইসলাম ত্যাগের মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করেছে।  দলিলে উল্লেখ নেই কিন্তু সম্ভবত অন্য শাস্তি দিয়েছে।   

14.    লাস্ট এক্সাম্পল  14 - ড. আমিরা আজহারী সনবল –“উইমেন,  দি ফ্যামিলি এন্ড ডিভোর্স ল’জ ইন ইসলামিক হিস্ট্রি”– এতে খেলাফত আমলের শারিয়া কোর্টে আইন বদলের উদাহরণ আছে।

যেমন 119 পৃষ্ঠায় আছে ইব্রাহিম ইসলামকে গালাগালি করে মুরতাদ হয়ে গেল – মুরতাদের বিয়ে এমনিতেই বাতিল হয়ে যায় তবু তার শ্বশুর মোস্তফা কোর্টে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করলে শারিয়া কোর্ট তাদের বিয়ে বাতিল ঘোষণা করে দেনমোহরের টাকা ফেরত দেওয়ার রায় দিল।

এখানে আমরা মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড দেখিনা।

শেষ দলিল  - লন্ডনের ডঃ শেখ ওসামা হাসানের এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা–

“ফ্রম ধিম্মিচুড টু ডেমোক্রেসি -  ইসলামিক  ল’, ননমুসলিমস এন্ড ইকুয়াল সিটিজেনশীপ”।

আপনারা যারা ইয়ং তারা এই অসাধারণ বইটা অনুবাদ করলে খুব ভালো হয়, উনার সাথে আপনাদের কারো পরিচয় থাকলে আমার সালাম পৌঁছে দেবেন। 

OK

একেবারে শুরুতে নবীজীর সময় থেকে অমুসলিমদের কাছ থেকে :-

(1) জিজিয়া নেয়া হতো –

(2) তাদের সৈন্যবাহিনীতে নেয়া হতনা,

(3) উচ্চপদে চাকরি দেয়া হতো না,

(4) মামলা মোকদ্দমায় তাদেরকে ইসলামী শারিয়া কোর্টে আসতে হতো।

১৪০০ বছর পর উসমানিয়া খেলাফতের সময় আমরা কি দেখি?

( A) সব ধর্মের লোকদেরকে সমান নাগরিক অধিকার।

(B)  জিজিয়া বন্ধ, দাস প্রথা উচ্ছেদ 

(C) অমুসলিমদেরকে সৈন্যবাহিনী এবং সরকারি চাকরিতে নেয়া শুরু ,

(D) অমুসলিমদেরকে তাদের নিজেদের ধর্মীয় কোর্ট ও স্কুলের অনুমতি।

“মিল্লেত সিস্টেম” সার্চ করলে সেটা পাবেন।

এই যে বিশাল বিপুল পরিবর্তন, এগুলি তো বাইরের চাপে হয়নি !

এগুলো তো খলিফারাই করেছেন!!

(সার্চ: - তানজীমাত কি ? তানজীমাত যুগে অটোমান তুরস্কে গৃহীত সংস্কারাবলি কী ছিল ? )

https://www.islamichistoryvirtualacademy.com/2022/07/What%20is%20Tanzimat%20The%20Reforms%20adopted%20in%20Ottoman%20Turkey%20during%20the%20Tanzimat%20movement.%20.html

এবারে কনক্লুশন 

দলিলে আমরা দেখলাম নবী সা নিজের এবং খলীফারা কোরআন সুন্নাহর কিছু বিধান বদলেছেন।

খেয়াল করুন ! 

যে বিধানগুলো বদলানো হয়েছে সেগুলোর,

প্রত্যেকটি, 

ব্যতিক্রমহীনভাবে এবং

অবধারিতভাবে

দুনিয়াদারীর বিধি-বিধান, ইবাদত বন্দেগীর নয়।

নামাজ চিরকাল পাঁচ ওয়াক্ত  থাকবে,

রমজানে রোজা চিরকাল থাকবে,

চিরকাল একই  থাকবে আমল এবাদত

তাকওয়ার বিধানগুলো কারণ ওগুলো কনষ্ট্যান্ট, শ্বাশ্বত।

কিন্তু দুনিয়া বদলের সাথে বদলেছে - বদলাবে ইসলামের দুনিয়াদারীর বিধানগুলো – ওগুলো ভেরিয়েবল।

সমাজ কল্যাণের জন্য এটাই করেছেন নবী সা নিজে ও মুসলিম খলিফারা।

             OVER TO YOU

                  END

Print