পাকিস্তান আন্দোলনের শ্লোগান কি ছিল? - হাসান মাহমুদ

1-. যে আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা বারবার দৃপ্তকণ্ঠে সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাবি করেছেন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছেন, সে আন্দোলনের মূলমন্ত্র ধর্মীয় স্লোগান হওয়া অসম্ভব।
2-. ভারতবর্ষে সর্বোচ্চ কিছু আলেম উলামা সহ অন্যান্য অনেক উলামা যে আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন, সে আন্দোলনের মূলমন্ত্র "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" হওয়া অসম্ভব।
সিম্পল ম্যাথ।
পাকিস্তান আন্দোলন থেকে এ পর্যন্ত আমরা অনেক রাজনৈতিক আন্দোলন দেখেছি। রাজনৈতিক আন্দোলন মানেই উত্তপ্ত রাজপথে তারুণ্যের বিস্ফোরণ, রাজনৈতিক আন্দোলন মানেই গণদ্রোহের রণহুংকার, রাজনৈতিক আন্দোলন মানেই শাসকের বিরুদ্ধে জনতার ভৈরব গর্জন।
রাজনৈতিক শ্লোগান এমনই হয় এবং এমনই হতে হয়। সেজন্যই ওই শ্লোগানের প্রভাবে শান্তশিষ্ট ছেলেমেয়েরাও উদ্দীপ্ত হয়ে বজ্র নির্ঘোষে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওটা হতে হয় দীপক রাগের রুদ্ররস - বলা হয় যার প্রভাবে চারপাশের নিভে যাওয়া প্রদীপ জ্বলে ওঠে, প্রচণ্ড তাপ ও আগুনের সৃষ্টি হয়। ওখানে ভৈরবী, ললিত বা সোহিনী রাগের অন্তর্লীন আধ্যাত্মিকতা চলেনা। কেউ দ্বিমত করতে পারেন কিন্তু আমার মনে হয় ইসলামের কলমাও প্রধানত: অন্তর্লীন আধ্যাত্মিক, ওটা উত্তেজনা বা সংঘর্ষের মূলমন্ত্র নয়। সেজন্যই জিহাদে বা যুদ্ধের মত অ্যাড্রেনালিন-মুহূর্তে আমরা শুনি "আল্লাহু আকবার" বা "তকবীর" শব্দের চিৎকার - কলমার নয়।
*******************************
1-. যে আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বারবার দৃপ্তকণ্ঠে সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাবি করেছেন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছেন, সেই আন্দোলনের মূলমন্ত্র ধর্মীয় স্লোগান হওয়া অসম্ভব।
(ক) "পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাজনীতি" - অ্যাম্বাসাডর কামরুদ্দিন আহমেদ - পৃষ্ঠা ৫২:- "ইসলামী রাষ্ট্র সম্বন্ধে কোন প্রকার প্রচারণার বাগাড়ম্বর থামিয়ে দেবার সুযোগ জিন্নাহ সাহেব নষ্ট হতে দিতেন না"। ১৯৪১ সালে কংগ্রেস নেতা কে. এম. মুন্সি বলেছিলেন পাকিস্তান কোরআন ভিত্তিক ধর্মীয় রাষ্ট্র হবে যেখানে অমুসলিমদের রাষ্ট্রপরিচালনার অধিকার থাকবে না। এর তীব্র প্রতিবাদে আলিগড় ইউনিভার্সিটির বক্তৃতায় জিন্নাহ "দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন - এ জাতীয় প্রচারণা শুধু হিন্দু ও শিখদের ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য করা হচ্ছে। পাকিস্তান একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হবে এবং সেখানে হিন্দু ও শিখদের সর্বপ্রকার ক্ষমতাহীন করে রাখা হবে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা"........ পাকিস্তান পরিকল্পনায় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানব শিশুর সমান অধিকার থাকবে"।
এই ঘোষণা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধী কারণ ইসলামের রাষ্ট্রে মুসলিম অমুসলিমের অধিকার সমান নয়। প্রমাণ আছে "শারিয়া কি বলে, আমরা কি করি" বইয়ের "শারিয়া আইনের উদাহরণ" অধ্যায়ে - এইসব আইন দিয়ে দেশ চালানো সম্ভব নয় - My You Tube event - শারিয়া আইনের উদাহরণ (16.5 min) https://www.youtube.com/watch?v=NJnmk72Fd3M&t=3s
(খ) "আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর" - আবুল মনসুর আহমেদ পৃষ্ঠা ২৪০:- "মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা মাহমুদাবাদ এর তরুণ নবাব এক বক্তৃতায় বলিয়াছিলেন যে পাকিস্তানে কোরআনের আইন অনুসারে শাসন কার্য চলিবে। জিন্না সাহেব পরদিনই তার প্রতিবাদে খবরে কাগজে বিবৃতি দিয়া রাজা সাহেবকে ধমকাইয়া দিয়াছেন এবং বলিয়াছেন পাকিস্তান একটি প্রগতিবাদী মডার্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হইবে"।
(গ) ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদে ঐতিহাসিক ভাষণে জিন্নাহ'র বুলন্দ ঘোষণা:- "সময়ের সাথে সাথে হিন্দুরা হিন্দু থাকবে না এবং মুসলিমরা মুসলিম থাকবে না - ধর্মীয় অর্থে নয় কারণ ধর্ম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। বরঞ্চ এটি হবে রাজনৈতিক অর্থে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে।"
***************************
2-. একটা গণআন্দোলনে বহুরকম শ্লোগান উঠে আসে, কিন্তু সেটাই বৈধ হয় যেটাকে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় শ্লোগান হিসাবে ব্যবহার করে। যেমন আমাদের ১৯৬৯ সালের পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে হরেক রকম শ্লোগানের মধ্যে আওয়ামী লীগ "জয়বাংলা"-কে সর্বদা দলীয় শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছিল। পাকিস্তান আন্দোলনের আন্দোলনের ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ কোন স্লোগানকেই দলীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করেনি। সেখানে জনপ্রিয় স্লোগানগুলো ছিল:-
1. হাথমে বিড়ি মুহমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান,
2. হাথমে লোটা মুহমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান,
3. কান মে বিড়ি মুহমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান,
4. লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, মরকে লেঙ্গে পাকিস্তান,
5. বন্কে রহেগা পাকিস্তান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান,
6. পাকিস্তান জিন্দাবাদ,
7. লে কর রহেঙ্গে পাকিস্তান,
8. পাকিস্তান কা মতলব কেয়া, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি।
মুসলিম লীগ এর কোনটাই দলীয় শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেনি। কাজেই বাকি শ্লোগানগুলোর উল্লেখ না করে ওই একটাকে হাইলাইট করাটা স্পষ্টত:ই উদ্দেশ্যমূলক এবং কোরান-বিরোধী - সুরা ইমরান ৬১, বাকারা আয়াত ৪২।
কোন মুসলিম কলমার বিরুদ্ধে গেলে সে সরাসরি মুরতাদ হয়ে যায়। পাকিস্তানে এমন ঘটনা ঘটেছে - কোন মাওলানা কাউকে মুরতাদ ঘোষণা করেছে - তদন্ত নেই পুলিশ-আদালত কিচ্ছু নেই - উন্মত্ত জনতা তাকে খুন করেছে। মুরতাদকে কেউ রাস্তাঘাটে খুন করলে শারিয়া আইন খুনীর মৃত্যুদণ্ড হবে না :- বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন ১ম খণ্ড, ধারা ৭২ ((এবং মদিনা সনদের ৪৭ টি ধারার ধারা # ১৪, কারণ মুরতাদ মানেই অমুসলিম) :-
আমার আর্গুমেন্ট - ভারতবর্ষে সর্বোচ্চ কিছু আলেম উলামা সহ অন্যান্য অনেক উলামা যে আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন, সে আন্দোলনের মূলমন্ত্র "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" হওয়া অসম্ভব। কোন মুসলিম ইসলামের কলমার বিরুদ্ধে একশনে নামা তো দূরের কথা, কিছু বললেও সে সরাসরি মুরতাদ। তাই যেহেতু মওলানা মওদুদী সহ সর্বোচ্চ ও খ্যাতনামা আলেমদের অনেকে পাকিস্তান আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন, সেহেতু ওই আন্দোলনের মূলমন্ত্র ইসলামের কলমা হওয়া অসম্ভব। কারণ সেক্ষেত্রে তাঁরা মুরতাদ হয়ে যেতেন। ইনাদের মধ্যে আছেন :-
1. অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের দুইবারের সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ,
2. জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতা, দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি
3. জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আ’লা মওদুদী
4. জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের শীর্ষ নেতা এবং দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী
5. জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের শীর্ষস্থানীয় আলেম মাওলানা সৈয়দ ফখরুদ্দিন আহমদ
6. প্রখ্যাত উর্দু কবি ও রাজনীতিবিদ মাওলানা হসরত মোহানি
7. অল ইন্ডিয়া মোমিন কনফারেন্সের নেতা মাওলানা আবদুল কাইয়ুম আনসারি
8. বিখ্যাত দেওবন্দী মাওলানা, রাজনীতিবিদ এবং সাংসদ মাওলানা হিফজুর রহমান সেওহারভি
9. 'মজলিস-ই-আহরার-ই-ইসলাম'-এর একজন শীর্ষ নেতা মাওলানা আতউল্লাহ বুখারী
10. জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষস্থানীয় আলেম মুফতি কিফায়াতুল্লাহ।
এছাড়া সারা ভারত জুড়ে আরো অনেক আলেম পাকিস্তান আন্দোলনের তীব্র বিরোধী ছিলেন। এটাই প্রমাণ করে ইসলামের কলমা পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান বা অন্যতম শ্লোগান কখনোই ছিল না, ছিল অনেক স্লোগানের একটা মাত্র।