পাক-ভারত স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম নারী

পাক-ভারত স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম নারী

সাহিল রাজভি -  নিউ এজ ইসলাম - 19 আগস্ট 2026

https://www.newageislam.com/islamic-personalities/muslim-women-india-freedom-struggle/d/141271

                                                                                         sahil.png

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পর্দা ও গৃহজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে আসা মুসলিম নারীদের নীরব সাহস ও অদম্য সংকল্পের কথা ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে মূলধারার বয়ানে কেবল গুটিকয়েক সুপরিচিত ব্যক্তিত্বের ওপরই আলোকপাত করা হয়েছে, যার ফলে এই নারীদের অনেকের অবদানই ইতিহাসের পাতায় কেবল পাদটীকায় সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। অথচ বিভিন্ন গবেষণাপত্র, স্মৃতিকথা এবং বিশেষায়িত গবেষণালব্ধ কাজ, যার মধ্যে ড. আবিদা সামিউদ্দিনের ‘হিন্দুস্তান কি জং-ই-আযাদি মেঁ মুসলিম খাওয়াতিন কা হিস্সা’ (ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—তাঁদের অংশগ্রহণের এক সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত আখ্যান তুলে ধরে; যে আখ্যান ১৮৫৭ সালের রণক্ষেত্র থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের শরণার্থী শিবির পর্যন্ত বিস্তৃত।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ঘটনাপ্রবাহে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নাটকীয় অধ্যায় রচিত হয়েছিল। অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের দ্বিতীয় স্ত্রী বেগম হযরত মহল তাঁর স্বামীর রাজ্য ব্রিটিশদের দ্বারা দখল বা অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি মেনে নিতে অস্বীকার করেন। নবাবকে কলকাতায় নির্বাসিত করার পর তিনি লখনউতেই থেকে যান; তিনি তাঁর নাবালক পুত্র বিরজিস কদরকে শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং নিজে অভিভাবক-শাসক (রিজেন্ট) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি সৈন্যবাহিনী সংগঠিত করেন, মন্দির ও মসজিদ ধ্বংসের নিন্দা জানিয়ে ইশতিহার জারি করেন এবং অসাধারণ রণকৌশল প্রয়োগ করে লখনউয়ের প্রতিরক্ষার নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশরা শহরটি পুনরায় দখল করে নেওয়ার পরেও তিনি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখেন; শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাঁকে নেপালে নির্বাসনে যেতে হয়, যেখানে ১৮৭৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সাধারণ নারীরাও সমান সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, যদিও তাঁরা হয়তো ততটা পরিচিতি পাননি। থানা ভবনের বাসিন্দা আসঘারি বেগম—যাঁর বয়স তখন চল্লিশের কোঠায়—ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নারী যোদ্ধাদের বিভিন্ন দল সংগঠিত করেছিলেন। ১৮৫৭ সালের অক্টোবরে মেজর সয়্যারের বাহিনী যখন শহরটি পুনরায় দখল করে, তখন তাঁরা তাঁকে বন্দী করেন এবং আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জনসমক্ষে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেন।

তাঁর পাশাপাশি মুজাফফরনগরের হাবিবা বেগম ও রহিমি খাতুনের মতো নারীদেরও ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল; সমসাময়িক নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, ওই অঞ্চলের দুই শতাধিক মুসলিম নারী এই সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছিলেন। স্থানীয় ইতিহাস ও পরবর্তীকালের গবেষণায় সংরক্ষিত এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রতিরোধ সংগ্রাম কেবল রাজপরিবারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

১৯১৯-২২ সালের খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় এই গণজাগরণের পরবর্তী বড় ঢেউটি আসে। এই পর্যায়ে মহাত্মা গান্ধী কর্তৃক ‘বি আম্মা’ বলে স্নেহে সম্বোধিত আবাদী বানু বেগম এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। ‘আলী ভ্রাতৃদ্বয়’-এর জননী আবাদী বানু বেগম যখন জনসভায় ভাষণ দেওয়া শুরু করেন, তখন তাঁর বয়স ষাটের কোঠার শেষ ভাগে; এমনকি তখনও তিনি প্রায়শই বোরকা পরিহিত অবস্থায় জনসমক্ষে আসতেন রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য রাখা প্রথম সারির মুসলিম নারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম; ‘তিলক স্বরাজ তহবিল’-এর জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি দেশজুড়ে ভ্রমণ করেন এবং নারীদের খাদি সুতা কাটার পাশাপাশি বিদেশি কাপড় বর্জনের আহ্বান জানান। খোদ গান্ধী ‘ইয়াং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় তাঁর প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক শক্তির কথা লিখেছিলেন। তাঁর পুত্রবধূ আমজাদি বেগমও তাঁর পাশাপাশি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন; স্বামী মোহাম্মদ আলী বারবার কারারুদ্ধ হওয়ার সময় তিনি আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

কবি ও বিপ্লবী হাসরাত মোহানির স্ত্রী নিশাতুন্নিসা বেগম পর্দা প্রথা ভাঙার ক্ষেত্রে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ‘উর্দু-ই-মুয়াল্লা’ পত্রিকায় রাষ্ট্রদ্রোহী লেখা প্রকাশের দায়ে যখন তাঁর স্বামীকে কারারুদ্ধ করা হয়, তখন তিনি পত্রিকাটির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন, আদালতে স্বামীর পক্ষে আইনি লড়াই চালান এবং পরবর্তীতে আন্দোলনের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ‘আলিগড় খিলাফত স্টোর’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশনে ভাষণ দেন, পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন জানান এবং ১৯৩৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, কীভাবে বহু মুসলিম নারী তাঁদের ব্যক্তিগত আনুগত্যকে জনজীবনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে রূপান্তরিত করেছিলেন।

১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে অংশগ্রহণের এমন কিছু ধারা দেখা গিয়েছিল যা হয়তো ছিল অপেক্ষাকৃত নিভৃত, কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে কোনো অংশে কম ছিল না। অল্প বয়স থেকেই গান্ধীর দ্বারা অনুপ্রাণিত কুলসুম সায়ানি ‘ইচ ওয়ান, টিচ ওয়ান’ (প্রত্যেকে একজনকে শেখান) নীতির ভিত্তিতে বয়স্ক সাক্ষরতা কেন্দ্র পরিচালনা করতেন এবং বোম্বাইয়ে মুসলিম নারীদের মধ্যে শিক্ষামূলক কার্যক্রমের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। বিবি আমতুস সালাম—যাঁকে গান্ধী নিজের দত্তক কন্যা হিসেবে গণ্য করতেন—তিনি বিভিন্ন আশ্রমে কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে নোয়াখালীর দাঙ্গার সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন; এমনকি ন্যায়বিচারের দাবিতে তিনি দীর্ঘ অনশনও করেছিলেন। হায়দ্রাবাদে বাজি জামালুন্নিসা ও সৈয়দ ফখরুল হাজিয়া হাসানের মতো নারীরা আত্মগোপনকারী আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দিয়েছেন, বিদেশি কাপড় পুড়িয়ে ফেলেছেন এবং যুদ্ধের পর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির বন্দিদের সহায়তা করেছেন।

দেশভাগ এই নারীদের এক ভিন্ন ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় যাঁঁর স্বামী খুন হয়েছিলেন, সেই বেগম আনিস কিদওয়াই তাঁর শোককে ত্রাণ ও পুনর্বাসনমূলক কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। গান্ধীর অনুপ্রেরণায় তিনি মৃদুলা সারাভাই ও সুভদ্রা জোশীর সঙ্গে মিলে অপহৃত নারীদের উদ্ধার, শরণার্থী শিবির পরিচালনা এবং চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও মানবিকতা পুনরুদ্ধারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সেই অন্ধকার সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা তাঁর স্মৃতিকথা ‘আজাদি কি ছাঁও মেঁ’ (Azadi Ki Chaon Mein) অন্যতম এক হৃদয়স্পর্শী দলিল হয়ে আছে। পরবর্তীকালে তিনি রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন এবং জনসেবার কাজ অব্যাহত রাখেন।

এই নারীদের মধ্যে যে বিষয়টি সাধারণ তা কোনো একক আদর্শ নয়, বরং তাঁদের সময়ের সীমাবদ্ধতা—যেমন পর্দা প্রথা, সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সামাজিক রক্ষণশীলতা—মোকাবিলা করে জাতীয় সংগ্রামে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করার এক যৌথ সংকল্প। কেউ লড়াই করেছেন তলোয়ার হাতে, কেউ বা চরকা ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে; কেউ নেতৃত্ব দিয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর, আবার কেউ বাড়ির আঙিনায় আয়োজন করেছেন নারীদের সভা-সমাবেশ। গবেষণার মাধ্যমে আরও অনেক নাম উঠে আসছে—যেমন মেদিনীপুরের রানা বানু, যিনি ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছিলেন; দীর্ঘ কারাবাসের সময় মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে যিনি সহায়তা করেছিলেন সেই জুলেখা বেগম; এবং এমন অসংখ্য নাম-না-জানা নারী, যাঁরা নিজেদের গয়না দান করেছিলেন কিংবা আত্মগোপনকারী নেতাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।

তাঁদের অবদান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা আন্দোলন কখনোই কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা লিঙ্গের একচেটিয়া বিষয় ছিল না। বিশেষায়িত গবেষণাপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা থেকে এই ঘটনাগুলোকে পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে আমরা ভারত কীভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সত্যনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরতে পারি। মুসলিম নারীদের সেই সাহসিকতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং স্বাধীন হওয়ার সংকল্পে অবিচল এক জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর সংগ্রামেরই তা ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

**********************************************************

 

 


Print