(কোথায় হারালো নবীজির (সা) এই শিক্ষা? পুরো ইসলামের ইতিহাসে তিনি হৃষ্টচিত্তে, সন্তুষ্টির সাথে কোন মুসলিমকে তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাবার অধিকার দিয়েছিলেন মাত্র ওই একবারই - নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার। অথচ আমরা "এর মানে ওই" আর "ওর মানে তাই" করে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে সেটাকে লংঘন করেছি)!
সংসার টিকিয়ে রাখা নারীর সহজাত প্রবৃত্তি। তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বহু সমস্যার মোকাবেলা করতে হয় যেমন সমাজে তার অরক্ষিতা ও সহজলভ্য ভাবমূর্তি, সন্তানের কাস্টডি, তার উপার্জন, অনেকেই বাসা ভাড়া দিতে চায়না, ছোটবোনের বিয়ের সমস্যা এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা-ও তাকে সহজভাবে নেয় না ইত্যাদি। সেই নারী যখন তালাকের আবেদন করেন তখন বুঝতে হবে তাঁর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন আমরা দেখব এ ব্যাপারে (ক) শারিয়া আইন, (খ) কোরান ও (গ) রসুল(স)
(ক) শারিয়া আইন -
শারিয়া আইন মোতাবেক তালাক দেয়া স্বামীর একচ্ছত্র অধিকার। স্বামী এখানে প্রকাণ্ড ও প্রচন্ড রাজাধিরাজ, এমনকি তালাকটা সে কেন দিচ্ছে সে প্রশ্ন করারও অধিকার কারো নেই এমনকি রাষ্ট্রেরও নেই। কিন্তু স্ত্রী তালাক চাইলে কোর্টে খুলা আইনে মামলা করতে হবে। স্বামী সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত মারপিট করলে, শারিরীক অক্ষম হলে, পরকীয়া করলে, খরচ দিতে না পারলে (ইত্যাদি) বিচারক নিজে থেকে বিবাহবিচ্ছেদ ঘোষণা করবেন, স্বামী সেটা মানতে বাধ্য। কিন্তু ওই কারণগুলো না থাকলে বিচারক এই শারিয়া আইন প্রয়োগ করবেন:-
"স্ত্রীর ইচ্ছার ভিত্তিতে তৎকর্তৃক প্রদত্ত মালের বিনিময়ে সমঝোতার মাধ্যমে স্বামী 'খুলা' বা অনুরূপ অর্থবোধক শব্দের প্রয়োগে তাহাকে বিবাহবন্ধন হইতে মুক্ত করিলে উহাকে 'খুলা' বলে" - বাংলাদেশ ইসলামী ফাউণ্ডেশন প্রকাশিত ৩ খণ্ডের বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন ১ম খণ্ড ধারা ৩৫৫, হানাফি আইন হেদায়া পৃষ্ঠা ১১২, শাফি’ই আইন #n.৫.0, শারিয়া দি ইসলামিক ল- ডঃ আবদুর রহমান ডোই, পৃঃ ১৯২ ইত্যাদি।
শারিয়া আইনের প্রয়োগ:-
আইনটার - "সমঝোতার মাধ্যমে" এবং স্বামী "তাহাকে বিবাহবন্ধন হইতে মুক্ত করিলে" অংশটুকু স্বামীর ট্রাম কার্ড। কারণ "সমঝোতা করা" হল স্বকর্ম, কেউ স্বইচ্ছায় "সমঝোতা” না করলে অন্য কেউ সেটা করতে পারেনা। আর, স্ত্রীকে "বিবাহবন্ধন হইতে মুক্ত" না করার একচ্ছত্র অধিকার। স্বামী ওই দুটো না করা পর্যন্ত বিচারকের ক্ষমতা নেই তালাকের রায় দেবার। বলাই বাহুল্য, স্বামী রাজী হবে কিনা, হলে কিসে রাজী হবে সেটা সম্পূর্ণ তার মর্জির ওপরে নির্ভর করে।
স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর মারপিট, "পরিমাণ মত" খরচ দিতে না পারা ইত্যাদি প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। বহুক্ষেত্রে আমরা দেখেছি ভালোমানুষ বিচারক প্রানান্ত চেষ্টা করছেন কিন্তু স্বামী তার "সমঝোতা"র অনেক মূল্য দাবী করছে যেমন স্ত্রীর ভরণপোষণ ও বাচ্চাদের কাস্টডি ত্যাগ ইত্যাদি ছাড়াও অনেক টাকা। স্বামী রাজী না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীকে ছুটোছুটি করতে হয়, বিনা বেতনের ছুটি নিতে হয় বা চাকরি ছাড়তে হয়, উকিলকে অজস্র টাকা ঢালতে হয়, সেই সাথে সমাজ পরিবারের ভ্রূকুটি ও বাক্যবাণ তো আছেই। ধর্মীয় তালাক না হলে সে আবার বিয়ে করতে পারে না, স্বামী কিন্তু পারে। এইসব মিলিয়ে এমন ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয় যে অসহায় স্ত্রী যতদিন পারে মুখ বুঁজে অত্যাচার সহ্য করে, কোর্টে যায় না।
তাছাড়া বিচারকদের ফেরেশতা মনে করারও কারণ নেই। অটোমান খেলাফত আমলে শারিয়া কোর্টের “শিকায়তে দফতরী”- (নালিশ বিভাগ) দলিলে আমরা দেখি:-
“সতেরো ও আঠারো শতাব্দীতে প্রচুর খুলা হইত… তালাকের পর মোহর আদায় করা স্ত্রীদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য ছিল…. . খুলা পদ্ধতিতে স্ত্রীকে যে কোন প্রাপ্য, এমনকি স্ত্রীর নিজের ও সন্তানদের ভরণপোষণও পরিত্যাগ করিতে হইত। এজন্য খুলার দলিলে এক অতিরিক্ত কাগজ সংযোজিত করা হয়। উহাতে সন্তানদের নাম, পিতার নাম ও সন্তানদের খরচের ব্যাপারে (স্বামীর দায়িত্ব নাই, এই ব্যাপারে) স্ত্রীর স্বীকৃতির কথা লিখা থাকে। ভিদিন অঞ্চলের হাওয়া খাতুন ১৭৮৩ সালে স্বামীকে খুলা-তালাক দেয়। তাহাকে মোহরের ৪০০০ অ্যাক্সেসের (তৎকালীন তুর্কী টাকা) অপরিশোধিত ১০০০ অ্যাক্সেস এবং ভরণপোষণের অর্থ পরিত্যাগ করিতে হয়...। জুলাই ১৮০২ সালে ইস্তাম্বুলের হালিমা খাতুন আসিয়া দাবি করিল যে মোহর পরিত্যাগ করিবার জন্য তাহার স্বামী আহমেদ তাহাকে খুলার জন্য চাপ দিতেছে...। দুর্নীতিপরায়ণ কাজিরা ষড়যন্ত্র করিত ও ঘুষ খাইত”- ‘উইমেন, দ্য ফ্যামিলি অ্যাণ্ড ডিভোর্স ল’জ ইন ইসলামিক হিস্ট্রি’ - ডঃ আমিরা আজহারি পৃঃ ৮৯, ৯২, ১০০, ১০৪, ইত্যাদি।
(খ) কোরান
নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে সংসার করানোর বিরুদ্ধে কোরআনের সুস্পষ্ট হুকুম- “জোরজবরদস্তি করে তোমাদের নিজেদেরকে নারীদের উত্তরাধিকারী গণ্য করা বৈধ নয়”। প্রত্যেক আলেম এটা সমর্থন করেন - মওদুদী তাঁর তাফহীমুল কুরআনে এ ব্যাপারে লিখেছেন –“এর অর্থ হচ্ছে, স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের লোকেরা তার বিধবাকে মীরাসী সম্পত্তি মনে করে তার অভিভাবক ও ওয়ারিস হয়ে না বসে। স্বামী মরে গেলে স্ত্রী ইদ্দত পালন করার পর স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা যেতে এবং যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারে” - https://amartafheem.com/surah/4/ayah/19
স্পষ্টত:ই, এই শারিয়া আইনটাও প্রচন্ড কোরআন বিরোধী- "(এক বা দু’বার তালাক দেবার পরে তালাক সম্পূর্ণ হবার আগে) স্বামী তাহার স্ত্রীকে আবার ফিরাইয়া লইতে পারে, স্ত্রীর সম্মতি থাকুক বা না থাকুক”- বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন ১ম খণ্ড ধারা ৩৫২। অর্থাৎ এক্ষেত্রে স্ত্রী হল গরু-ছাগল, তার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোনোই মূল্য নেই যা সরাসরি কোরান-রসূল (স) বিরোধী।
"হে নবী, আপনার পত্নীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা কর, তবে আস, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় নেই। পক্ষান্তরে যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও পরকাল কামনা কর, তবে তোমাদের সৎকর্মপরায়ণদের জন্য আল্লাহ মহা পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন" - আল আহযাব ২৮ ও ২৯।
কথা পরিষ্কার। আল্লাহ সুস্পষ্ট শব্দে বাক্যে নবীপত্নীদেরকে শর্তহীন অধিকার দিয়েছিলেন তাঁকে ছেড়ে যাবার। তা তাঁরা যাননি সেটা তাঁদের সিদ্ধান্ত, কিন্তু তাতে তাঁদের অধিকারটা মোটেই ক্ষুণ্ন হয়নি।
(গ) রসুল (স) - এক অবিশ্বাস্য সত্য :-
সহি বুখারী, মদিনা ইউনিভার্সিটির ডঃ মুহসিন খানের অনুদিত, ৭ম খণ্ড হাদিস ২০৬ (কিংবা হাদিস নং ২৪৭৭ - অনুবাদ হাফেজ আবদুল জলিল):- “এখনও আমার চোখে ভাসিতেছে যে, বরীরার স্বামী মুগীস কাঁদিতেছে এবং তাহার পিছুপিছু ছুটিতেছে। চোখের পানিতে তাহার দাঁড়ি ভিজিয়া গেল। দেখিয়া নবী করীম (দঃ) বলিলেন, ‘হে আব্বাস ! বরীরার প্রতি মুগীসের ভালবাসা আর মুগীসের প্রতি বরীরার উপেক্ষা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক !’ তিনি বরীরাকে বলিলেন, ‘তুমি যদি মুগীসকে পুনরায় গ্রহণ করিতে !’ সে বলিল, ‘ইয়া রসুলুল্লাহ ! ইহা কি আপনার নির্দেশ ?’ তিনি বলিলেন, ‘আমি ইহা সুপারিশ করিতেছি।’ বরীরা বলিল, ‘মুগীসের প্রতি আমার কোন আকর্ষণ নাই’।”
কি মনে হয় ? মুগীস অত্যাচারী ছিলনা বরং সে বরীরাকে এতই ভালবাসত যে সে “কাঁদিতেছে এবং তাহার পিছুপিছূ ছুটিতেছে, চোখের পানিতে তাহার দাঁড়ি ভিজিয়া গেল”। এত ভালবাসার পরেও বরীরার “মুগীসের প্রতি আমার কোন আকর্ষণ নাই”। নবীজী (স) কি করলেন? দেখুন মওলানা মুহিউদ্দনের অনুদিত কোরাণ, পৃষ্ঠা ২৭১:-

এটাও দেখুন - ডঃ মুহসিন খানের অনুদিত বুখারী ৭ম খণ্ড হাদিস ১৯৯:- “থাবিত বিন কায়েসের স্ত্রী রসুলের নিকট আসিয়া বলিল, ‘হে আল্লাহ’র রসুল ! থাবিত বিন কায়েসের চরিত্র বা দ্বীনদারীর উপর আমার কোন অভিযোগ নাই। কিন্তু আমার ভয় হইতেছে আমি আল্লাহ’র অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকিতে পারিব না’ (অর্থাৎ স্বামীর প্রতি কর্তব্যে গাফিলতি হতে পারে -হাদিস ২৪৮৩, হাফেজ আবদুল জলিল)। ইহাতে রসুল বলিলেন, ‘তুমি কি তাহার বাগানটা ফেরৎ দিতে রাজি ?’ সে বলিল, ‘হ্যাঁ।’ অতএব সে তাহাকে বাগান ফেরৎ দিল এবং রসুল (দঃ) থাবিতকে তালাক দিতে বলিলেন”।
অর্থাৎ স্বামী ভালোবাসলেও কিংবা দ্বীনদার ভাল মানুষ হলেও নারী বাধ্য নয় তার সাথে সংসার করতে। শুধুমাত্র স্ত্রীর ইচ্ছের ভিত্তিতে নবীজী (স) বিয়ে বাতিল করেছেন।
এটাও দেখুন - এক নারী এসে বলল তার বাবা জোর করে তার বিয়ে দিয়েছে। রসুল (স) সটান তাকে তার সিদ্ধান্ত নেবার সম্পূর্ণ অধিকার দিলেন - (রিভার্টেড দি ম্যাটার টু হার) - সহি ইবনে মাজাহ ৩য় খণ্ড ১৮৭৪ ও ১৮৭৫।
চলুন আমরা আমাদের নবীজীর (স) সিদ্ধান্তকে সম্মান করি, ওই খুলা আইনটা বাতিল করি। অনেক মুসলিম দেশে ওটা বাতিল হয়েছেও। মিসর ২০০০ সালে আইন পাশ করেছে কোনো স্ত্রী স্বামীকে দেনমোহর ফিরিয়ে দিয়ে তালাক চাইলে তালাক হবে, কারো কাছে কোনো দেনদরবার করতে হবেনা। আইনটা নিশ্চয় আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ও অন্যান্য মুফতিদের অনুমোদন নিয়েই করা হয়েছে কারণ সেটা ছাড়া মিসরে আইন পাশ করা দুরূহ। আসলে এটা ইহুদী আইন "গেট" - স্ত্রী চাইলেও স্বামীর সম্মতি ছাড়া বিবাহ-বিচ্ছেদ হবেনা। অর্থাৎ একটা ইহুদী আইনকে শারিয়া বইতে ঢুকিয়ে "আল্লাহ'র আইন" হিসেবে মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছে।