কি রেখে গিয়েছিলেন রসুল (স)?

আমাদেরকে শেখানো হয়েছে বিদায় হজ্বে নবীজী (স) বলেছেন তিনি রেখে যাচ্ছেন কোরান ও তাঁর সুন্নাহ - এ দু'টো ধরে রাখলে আমরা “কোনদিন পথভ্রষ্ট হবনা”। কিন্তু সহি হাদিসে অন্য কিছু পাচ্ছি। এক রসুল (স), এক বিদায় হজ্বের এক ভাষণ, - কিন্তু তিন তিনটে ভিন্ন ও সাংঘর্ষিক রিপোর্ট !!

আমাদের সমস্যা এই যে আমরা গঠনমূলক আত্মসমালোচনা নিজেরা তো করিই না, অন্য মুসলিম করলে সেটা সহ্যও করিনা। কিন্তু গঠনমূলক আত্মসমালোচনা ছাড়া কি কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে? পারে না। আমাদের সুন্নী হাদিসে অজস্র ভালো হাদীস আছে, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে কিছু উদ্ভট, অপ্রয়োজনীয়, অবৈজ্ঞানিক, হাস্যকর ও হিংস্র হাদিস। হাদিসগুলো পড়লেই তা দেখতে পাবেন। গিরগিটি ও বানরের পরকীয়া (বুখারী ৫-১৮৮, ইবনে মাজাহ ৪-৩২৩০)-এর মতো উদ্ভট হাদিস নিয়ে সমস্যা নেই কারণ ওতে মানবাধিকারের কিছু এসে যায় না। বিপদের কথা হলো, পুরুষতন্ত্র ঠিকই জানত কোরান নিয়ে তারা বেশী খেলতে পারবে না - কাজেই "নবীজী বলিয়াছেন" বলে হাদিস বানিয়ে মানবতা ও নারী-বিরোধী শারিয়া আইনগুলোকে সে সাফল্যের সাথেই বৈধ করেছে। যেমন নারী নেত্রীত্বের বিরুদ্ধে (বুখারী ৫-৭০৯), নারীর মুসলমানী'র বর্বরতা ইত্যাদি। এর অজস্র উদাহরণ দেয়া আছে "শারিয়া কি বলে, আমরা কি করি" বইতে।

আমরা খেয়াল করিনা, শারিয়া আইন বানানো হয়েছে হাদিস সংগ্রহের অনেক আগে। অর্থাৎ মানবাধিকার ও নারী-বিরোধী শারিয়া আইন বানিয়ে সেটাকে বৈধ করার জন্য জাল হাদিস বানানোর সুযোগ ছিল। এইসব কারণে সেই ৯ম শতাব্দীতেই ইবনে আবি হাতিম-এর মত মুসলিমেরা সোচ্চার প্রতিবাদ করেছিলেন হাদিসের বিরুদ্ধে, এখন করছেন “আহলে কোরান” অর্থাৎ "শুধুই কোরান" দল। কিন্তু তাঁরা হয়তো খেয়াল করেন না যে, সহি সিত্তা (সহি বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ) হল বিশ্ববাসীর ইতিহাসে ধর্মসংক্রান্ত এক অসাধারণ ও মৌলিক দলিল। অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়েরই এমন দলিল নেই। এতে শুরুর দিকের মুসলিম-জাতির বিবর্তন বিস্তারিত ধরা আছে বিভিন্ন অঙ্গনে যেমন পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, মানবাধিকার সংক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, সাফল্য, ব্যর্থতা, নিজেদের মধ্যে আন্তর্কলহ ও যুদ্ধ (ফিৎনা) ইত্যাদি। ঢালাওভাবে হাদিস অস্বীকার করলে আমরা সে সম্পদ হারাব, আমাদের ইতিহাস ভুলে যাব।

এবারে একই বক্তৃতার তিন তিনটে ভিন্ন ও সাংঘর্ষিক দলিল দেখাচ্ছি। নবীজী রেখে গেলেন, “যা ধরে রাখলে আমরা কোনদিন পথভ্রষ্ট হবনা”, কি সেটা?

১. কোরান ও সুন্নাহ, অথবা

২. শুধুই কোরান, অথবা

৩. কোরান ও তাঁর প্রজন্ম।

এর কোনটা বিশ্বাস করব এবং কেনই বা করব ? এ তিনটের একটা সত্য হলে কোনটা সেটা? এবারে সূত্রগুলো যাচাই করা যাক –

১. উনি রেখে গেলেন শুধুই কোরান “যা ধরে রাখলে আমরা কোনদিন পথভ্রষ্ট হবনা”। এটা সুস্পষ্ট ধরা আছে সহি মুসলিম বুক ৭-২৮০৩, বুক ৩১-৫৯২২, সহি আবু দাউদ (বাংলা) ৩য় খণ্ড ১৯০৩ ও সহি ইবনে মাজাহ ৪র্থ খণ্ড ৩০৭৪ হাদিসে। এর সমর্থনে হজরত ওমরের ভাষ্যে আছে সহি বুখারী ১ম খণ্ড-১১৪ ও ৯ম খণ্ড ৩৭৪ ও ৪৬৮ হাদিসে- "শুধু কোরানই আমাদের জন্য যথেষ্ট"।

২. উনি রেখে গেলেন কোরান ও তাঁর প্রজন্ম “যা ধরে রাখলে আমরা কোনদিন পথভ্রষ্ট হবনা”। এটা ধরা আছে ওই সহি মুসলিমেই, ৫৯২০ হাদিসে। এর সমর্থন আছে হাফেজ মওলানা গরীবুল্লাহ ইসলামাবাদী দেওবন্দীর'র অনূদিত "আশারা মুবাশশারা" বইয়ের ১৬৩ পৃষ্ঠায়।

(৩) উনি রেখে গেলেন কোরান ও তাঁর সুন্নাহ “যা ধরে রাখলে আমরা কোনদিন পথভ্রষ্ট হবনা”। এটা সহি সিত্তা হাদীসগুলোর কোত্থাও নেই (সহি বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)।

কে কাকে ঠকাচ্ছে তাহলে?

 

Print